কোমর ব্যথায় অপারেশন কেন?

69

মো. মুজিবুল হক শ্যামল

প্রচণ্ড কোমর ও পা ব্যথা নিয়ে আমার বডি রিহ্যাব ফিজিওথেরাপিতে পরামর্শ নিতে আসেন একে. এম. মুসলেম, বয়স ৭২। দেখে এত বয়স হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না, লম্বা-ফিটফাট আকর্ষণীয় শরীরের অধিকারী, একজন ব্যবসায়ী। বিগত অনেক বৎসর যাবত কোমর ব্যথা নিয়ে কষ্ট পাচ্ছেন, কোমর ব্যথা এমন এক পরিস্থিতি পায়ের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। ব্যথার কারণে কোন কিছুই ভালো করে করতে পারেন না, শোয়া থেকে শুরু করে বসাও দায় উনার জন্য। আমার কাছে আসার পর কান্নাভেজা চোখে বলছেন ব্যথার কথা। আমার সাথে কথা বলার পর কিছুটা শক্তি পান এবং আমি উনাকে আশস্ত করি ব্যথা কমে যাবে। ইতোমধ্যে উনি ভারতের বিখ্যাত হাসপাতাল ও বাংলাদেশে বিভিন্ন বড় বড় ডাক্তারের পরামর্শ নেন এবং ফিজিওথেরাপি নিতে বলেন। কিছুদিন থেরাপি দিয়ে বন্ধ করে দেন এবং কিছুদিন পর ব্যথা আবার শুরু। ভারতে ডাক্তারগণ অপারেশনের কথা বলে, তবে এটি ৫০/৫০ হতে পারে আবার নাও হতে পারে, হলেও কোমর থেকে নিচের অংশ অকেজো হয়ে যেতে পারে। আসলে উনার এম.আর.আই রির্পোট অনুযায়ী কোমরের (লাম্বার পজিশনে এল-৩, এল-৪, এল-৫/এই ৩টি ডিস্ক স্পাইন কর্ডে আগাত করে) অর্থাৎ তিনটি ডিস্ক স্থানচ্যুত হয়েছে/ এটাকে ডিস্ক হার্নিয়েশন (নরম জেলিরমত/ নিউক্লিলাস, অনুউলাস স্থান থেকে সরে গেছে) বলে থাকে। কোমরের ডিস্ক হার্নিয়েটেড রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যথার মাত্রা বেশি থাকে তাই কোন কিছু উপদেশ করলে রোগীরা পালন করা সম্ভব হয় না। এ কারণে প্রায় ডাক্তারগণ অপারেশন সাজেশ করেন বা খণ্ডকালীন পরিত্রানের জন্য ইনজেকশন পুশ করতে বলেন, এ জন্য তিনি কিছুটা ঘাঁবড়ে যান, তাই তিনি দেশে ফিরে আসেন। আমার কাছে আসার পর উনার প্রতিটি রির্পোট, পরীক্ষা, উনি কোন পেশাতে আছেন, কি কি কাজ করেন, পুরো হিস্টি শুনি।
এরপর উনাকে ভয় ভিত্তির ঊর্ধ্বে সাহস দি ও মোটিভেশন কাউনসিলিং করি এবং ধৈর্য্য ধরে থেরাপি দিতে বলি, টানা আপনাকে ৪০-৫০ দিন থেরাপি দিয়ে যেতে হবে এবং কয়েকদিন পর- কি হবে সেটাও বলে আশস্থ করি, তবে শেষ কথা হলো আপনাকে অবশ্যই অবশ্যই ধৈর্য্য ধরতে হবে এবং আত্মবিশ্বাস নিয়ে থেরাপি দিতে হবে তবেই আপনি উপকার পাবেন। এভাবে প্রতিদিন ১ ঘন্টা করে ২২ দিন থেরাপি দেয়ার পর মুসলেম সাহেবের ব্যথা কমতে শুরু করেছে এবং এখন উনি বসতে বা শোতে পারেন, আমি বললাম আরও কিছুদিন থেরাপি দিয়ে যেতে, অবস্থা দেখে থেরাপি বন্ধ করবেন। আমাদের দেশের রোগীদের মধ্যে একটি জিনিসের খুবই দেখতে পাই সেটি হল এখন আসছেন এখনই ভালো হতে চান। রোগীরা চিন্তা করে না আপনার যে সমস্যা এটি কোন একদিন বা মাসে হয়নি, বিগত কয়েক বৎসরে ভুল ভঙ্গিতে থাকতে থাকতে এ ব্যথার উৎপত্তি। এ ব্যথা দ্রুত সপ্তাহের মধ্যে সেরে যাবে, এমন ভাবা একদম ঠিক না। প্রতিটি চিকিৎসার নির্দিষ্ট একটা সময় আছে সে সময় পর্যন্ত আপনাকে ধৈর্য্য ধরতে হবে।
আর আমাদের দেশের ডাক্তাররা প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীদের নির্দিষ্ট সময়, আন্তরিকতা, ভালো ব্যবহার না করার কারণে রোগীরা ডাক্তারদের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। আমি প্রায় সময় রোগীদের ১০০% সত্য কথা বলার পরও রোগীরা কথা বিশ্বাস করতে চান না। আমি সামান্য একজন ফিজিওথেরাপিষ্ট হিসাবে উপলব্ধি করেছি, যে পরিমাণ রোগী দেশের বাইরে যাচ্ছে (ভারতে)/ সাথে দেশের টাকা বাইরে যাচ্ছে, এটিকে এখন বর্ডার লাইন দেয়ার সময় এসেছে। আর যাঁদের আর্থিক স্বচ্চলতা ভাল তাঁরা চলে যাচ্ছেন ইউরোপ, আমেরিকা বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশে। খুবই সামান্য রোগ হলে দেশের মানুষ চলে যাচ্ছেন বাইরে এটি দেশের চিকিৎসা শাস্ত্রের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। আমি বিশ্বাস করি উন্নত দেশ থেকে আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা কোন অংশে কম নয়, যদি আমরা সবাই একটু আন্তরিক হই।
রোগ নির্ণয়

রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে রোগের ইতিহাস, উপসর্গ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি লাম্বো-সেকরাল স্পাইনের (মেরুদন্ডের নিচের অংশ) এক্স-রে, এম.আর.আই করার প্রয়োজন পড়ে। তবে এক্সপার্ট কোন ডাক্তার বা থেরাপিষ্ট হলে মাঝে মাঝে হিস্টি শুনে কোমর ব্যথার ওষুধ এবং টানা ফিজিওথেরাপি দিয়ে রোগীকে ভালো করা সম্ভব।
চিকিৎসা

নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী বিশ্রাম, ব্যথানাশক ঔষধ, মাসল রিলাক্সান্ট জাতীয় ওষুধ আর সঠিক ফিজিওথেরাপি বা ব্যায়ামের মাধ্যমে এবং ডেলি একটিভিটি লিভিং মেনে চললে রোগী ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে।
মনে রাখা প্রয়োজন এ জাতীয় রোগে শরীরে ব্যথার জায়গায় মালিশ করা চলবে না, এতে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। নারকেল তৈল মালিশ করে শুধুমাত্র গরম বা ঠাণ্ডা সেঁক দিতে পারেন।