যেখানে প্রতিবন্ধী সিয়াম কথা শিখেছে, দাঁড়াতে শিখেছে মরিয়ম

144

রাঙ্গুনিয়ার পূর্ব সৈয়দবাড়ির প্রবাসী মনছুর আলম ও আনজু আক্তারের একমাত্র সন্তান সিয়াম। পরিবারের সবার আদরের সিয়ামের বয়স দুই বছর পার হলেও হাঁটতে পারেনি, এমনকি কথাও বলতে পারতো না। সেরিব্রাল পালসির শিকার ছেলেটির শারীরিক বিকাশ হচ্ছিল ধীরগতিতে। এক চিকিৎসকের পরামর্শে সিয়ামকে রাঙ্গুনিয়ার প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে নিয়ে তার বাবা-মা। সেখানকার চিকিৎসক সিয়ামকে নিয়মিত কাউন্সিলিংয়ের পাশাপাশি তাকে প্যাসিভ স্ট্রেচিং, ম্যানুয়্যাল রেজিসটেড এক্সারসাইজ, আইসোমেট্টিক ট্রেইনিং, গেইট ট্রেইনিং সহ নানা ফিজিওথেরাপী দিয়ে চিকিৎসা শুরু করেন। চিকিৎসার কয়েক মাসের মধ্যে তার হাত ও পায়ের মাসেলে শক্তি বাড়তে থাকে, স্পীচ থেরাপির মাধ্যমে মুখের জড়তা কাটিয়ে কথা বলাও শিখে গেছে সে। সিয়াম এখন নিজে নিজে হাটতে পারে। আদরের পুত্রকে নিয়ে বাবা-মার চোখে আশার আলো ফিরে আসে।

শুধু শিশু সিয়াম নয়, সব প্রতিবন্ধী মানুষই সেবা পাচ্ছে রাঙ্গুনিয়ার প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে। এখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিনা মূল্যে সহায়ক উপকরণ বিতরণ, অটিজম বিষয়ক সেবা, কাউন্সিলিং, থেরাপি (ফিজিও, অকুপেশনাল ও স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ) ও চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হয়।

সিয়ামের মতো অন্য এক শিশু বিবি বিবি মরিয়ম। তাকে যখন প্রথম এখানে আনা হলো তখন তার বয়স ছিল একবছর। তখন সে বেশিক্ষণ ঘাড় সোজা রাখতে পারতো না। কয়েক সেকেন্ড পরপর ঘাড় এলিয়ে পড়তো মায়ের কাঁধে। পা’টাও ছিল বাঁকা, চোখেও ছিল নানা সমস্যা। মা ছেনোয়ারা বেগম (৩০) জানান, ‘জন্মের পর থেকে তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না। জন্মের সময় মাথায় আঘাত পাওয়ার কারণে সে নিউরো ডেভেল্পমন্টাল ডিজ অর্ডারে ভুগছিল বলে ডাক্তার জানিয়েছে। দীর্ঘ দুই বছর নিয়মিত চিকিৎসার পর মরিয়ম এখন নিজে নিজে বসতে পারে, মাথা ও ঘাড় সোজা করে দাঁড়াতে পারে। মা-বাবা বলে ডাকতে পারে। এ সবকিছু সম্ভব হয়েছে ডাক্তারদের চেষ্টায়।’

কেন্দ্রের চিকিৎসক (কনসালট্যান্ট ফিজিওথেরাপি) মামুন হোসাইন বলেন, ‘ভালো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি। রোগী আর স্বজনদের মুখে হাসি দেখলে আমাদেরও ভালো লাগে।’

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে পৌরসভার ভবানী গেটের উত্তর পাশে মধ্যম নোয়াগাঁও ওয়ার্ডে এটি চালু হয় ২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। চট্টগ্রাম জেলায় স্থাপিত দুটি কেন্দ্রের এটি একটি,  অন্যটি নগরের হালিশহরে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কেন্দ্রে রোগীর ভিড়। রাঙ্গুনিয়া ছাড়াও পাশের উপজেলা রাউজান, বোয়াখালী থেকেও এসেছেন প্রতিবন্ধী রোগীরা। দায়িত্বরতরা জানালেন আশেপাশের উপজেলা নয় এমনকি পার্বত্য অঞ্চলের কাপ্তাই, বেতবুনিয়া, রাজস্থলি থেকেও এখানে রোগী আসে। সপ্তাহের বৃহস্পতি ও শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এখানে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসার পাশাপাশি দরিদ্র রোগিদের বিনামূল্যে হুইল চেয়ার, ট্রাইসাইকেল, সাদাছড়ি, হিয়ারিং এইড, ক্রাচ, স্টান্ডিং ফ্রেম, ওয়াকিং ফ্রেম, কর্নার চেয়ার দেয়া হয়েছে।

প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘প্রতি দিন ৬০-৭০ জন রোগী আসে, যারা গড়ে ১০০ টি সেবা নিয়ে থাকেন। এই কেন্দ্রে স্ট্রোক-প্যারালাইসিস, ফ্রোজেন সোল্ডার, অকুপেশনাল থেরাপী, স্পিচ এ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপী, মোবাইল থেরাপী ভ্যান সার্ভিস, বাত-ব্যথা, স্পন্ডালাইটিস, অর্থ্রাইটিস, স্পোর্টস ও আঘাতজনিত সমস্যা, সেরিব্রাল পলসি ও প্রতিবন্ধিতা, কাউন্সিলিং ও প্রশিক্ষণ সুবিধা দেয়া হয়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ‘ সমাজকল্যাণ মন্ত্রাণালয়ের অধিনে পরিচালিত এই প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে রোগীদের আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে অভিজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা সর্বোচ্চ সেবা দেওয়া হয়।’