স্বপ্ন জয়ের গল্প ও বাংলার ফিজিওর নির্মম সত্যতা

0
35

ওয়েব ডেস্ক: উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাশ করার পর অনেকের মত ডাক্তার হওয়ারই স্বপ্ন ছিল। এম,বি,বি,এস-এ চান্স না পেলেও ভর্তির সুযোগ হয়েছিল পঙ্গু হাসপাতালে নতুন শুরু হওয়া বি,এস,সি ইন ফিজিওথেরাপী কোর্সে। শুরুটা ভাল হলেও ধীরে ধীরে এটা আমার জন্য কঠিন হয়ে গেল। তারপর এখান থেকে পাশ করে নামের আগে ডাক্তার লেখা যাবেনা এ তথ্যটা জানাও আমার জন্য কাল হল। কোর্সের সাথে আমি অথবা আমার সাথে কোর্স ভাল যাচ্ছিল না। পারফরমেন্স ভাল হচ্ছে না, সাপলিমেন্টারির বোঝা বাড়ছে। অবশেষে ২য় প্রফেশনাল পরীক্ষার পর কোর্স থেকে বের হয়ে আসতে হল। এক অথৈ সাগরে পরলাম। কিন্তু, ধৈর্য হারা হয়নি। “ যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের জন্য আছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা” আল্লাহ্তায়ালার এই বাণী আমাকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে সবসময়। তখন রেগুলার কোন সেশনে ভর্তি হওয়ার কোন সুযোগ আর ছিল না। তাই উচ্চমাধ্যমিক পাশ থাকতে হবে কিনা এই ভয়ে প্রাইভেটে বি,এ (পাশ) কোর্সে ভর্তি হলাম। একটা প্রথম বিভাগ পাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম। তখন ডিগ্রীতে ইংরেজীতে ৪০ এর অতিরিক্ত মার্কস মূল মার্কসের সাথে যোগ হত। তাই ইংরেজীতে ভাল করার জন্যই বেশী পরিশ্রম করলাম। ডিগ্রীতে আমি অল্প মার্কসের ব্যবধানে প্রথম বিভাগ পাইনি কিস্তু ইংরেজীর জন্য বিশেষ পরিশ্রম আমার বিফলে যায়নি।
ডিগ্রী পাশের পর আর এক সাগরে পরলাম। এই ডিগ্রী দিয়েতো ভাল কিছু দূরে থাক, কোন কিছু করাই কঠিন। তখনও ডিগ্রী পাশ দিয়ে বি,সি,এস দেয়া যেত। তবে বি,সি,এস এর ব্যাপারে আমার কোন কনফিডেন্স ছিল না আর তখন দীর্ঘদিন কোন সার্কুলারও ছিলনা। ডিগ্রী পাশ থাকতে হবে এই চিন্তা নিয়েই একটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে মাস্টার্সে ভর্তি হলাম। সাবজেক্ট চয়েজ এর ক্ষেত্রে আমার যেটা সবচেয়ে ভাল লাগে ও প্রথম শ্রেণী পাওয়া যাবে সেরকম একটি বিষয় ‘ইসলামিক স্টাডিজ’ সিলেক্ট করলাম। এর মধ্যে ২৪তম বি,সি,এস এর সার্কুলার হল। কনফিডেন্স না থাকলেও ডিগ্রী পাশ দিয়ে বি,সি,এস দেয়া যাবে এই আনন্দ নিয়েই ফর্ম পূরণ করলাম। প্রিলিমিনারী পরীক্ষা দিতে গিয়ে মনে হল আরে আর একটু পরিশ্রম করলেই প্রিলিমিনারি পাশ করতাম। মন খারাপ নিয়ে পরীক্ষা হল থেকে বের হয়ে শুনলাম- প্রশ্ন আউট হয়ে গিয়েছে। এর পর কয়েকদিন পর খবর হল প্রিলিমিনারী পরীক্ষা আবার নেয়া হবে। এবার আর ছেড়ে দিলাম না। ইসলামিক স্টাডিজ-এ মাস্টার্স করতে যাওয়ার অনেক আগেই শিখেছিলাম সূরা বাকারার কয়েকটি আয়াত-“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ্র কাছে সাহায্য চাও নামাজ এবং ধৈর্যের মাধ্যমে, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।”

এই আয়াতগুলো সবসময়ই আমার পাথেয়। ২৪তম বি,সি,এস এর ভাইভার আগে আর কোন চাকরীর চেষ্টাই করিনি। ভাইভার পরে একটা প্রইভেট ব্যাংকে চাকরী হয়। ডিগ্রী পাশ দিয়েই ২৫এরও ভাইভা দিয়েছিলাম। ২৬তম বি,সি,এস এ আবেদনের আগেই মাস্টার্স কমপ্লিট হয়। প্রথম শ্রেণীর মাস্টার্স দিয়ে প্রফেশনাল ক্যাডারে আবেদন করি। আল্লাহ্র কাছে তীব্র চাওয়া এবং ধৈর্য আল্লাহ্ বিফল করে দেননি। কারণ আল্লাহ্ বলেছেন-“নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সৎকর্মশীলদের কর্মকে বাতিল করে দেন না।” তাই ২৫তম বি,সি,এস এর ভাইভার আগেই ২৬ এর ফল প্রকাশ হয় এবং লেখাপড়া করা ও করানোর সম্মানজনক জীবিকায় নিশ্চিন্তে যোগদান করি।

এত কিছুর মধ্যেও আমি আমার স্বপ্ন থেকে বিচ্যুত হইনি। ডাক্তার হতে পারিনি তাই ‘ডক্টর’ হতে হবে। লেগে গেলাম সরাসরি পি-এইচ,ডি কোর্সে ভর্তির সংগ্রামে। এ পথও অত্যন্ত বন্ধুর ছিল। মান সম্মত ২টি পাবলিকেমন, স্বীকৃত গবেষণা জার্নালে তা প্রকাশ, দুই বছরের চাকরীর অভিজ্ঞতা এবং পি-এইচ,ডি-এর বিষয় পছন্দ নিয়ে বেশ কয়েক বছর লেগে গেল। অবশেষে ভর্তির সু
যোগ হল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পি-এইচ,ডি কোর্সে। সুপারভাইজার হিসাবে পেলাম অত্যন্ত সহানুভূতিশীল একজন অভিভাবক আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রফেসর ড. মাহবুবুর রহমান স্যার কে। এরপর সরকারি অনুমতি গ্রহণ, সেমিনারে মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকায় আলোচকদের তীব্র বিরোধিতা এবং আরও অনেক সমস্যার মুখোমুখি হয়ে দীর্ঘ পাঁচ বছরেরও অধিক সময়ের প্রচেষ্টায় পি,এইচ-ডি ডিগ্রী অর্জন করেছি। গত ৮/০১/২০১৫ তারিখে সরকার নামের পূর্বে ‘ডক্টর’ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। এর মাধ্যমে একটা বড় স্বপ্ন পূর্ণতা লাভ করেছে। নিরবিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা এবং আল্লাহ্তায়লার উপর অবিচল আস্থা ও ভরসার জয় হয়েছে। আল্লাহ্তায়ালার কাছে শুকরিয়া আদায়ের কোন শেষ নেই।

তবে স্বপ্ন দেখা এখনও ছেড়ে দেইনি, নতুন এক স্বপ্নের পিছনে লেগেছি। ইনশাআল্লাহ্ হয়াল আজীজ…এবারও বিফল হব না।