অটিস্টিক শিশুদের জন্য ভালবাসা



  • Add Comments
  • Print
  • Add to Favorites

ইসহান এওয়াস্তি আট বছরের বালক। স্কুলের কাজ তার কাছে অসম্ভব মনে হচ্ছিল। তার গ্রেড ছিল খুবই খারাপ। শিক্ষকদের বকুনি, বাবার ধমক তার কাছে ছিল নিত্তনৈমিত্তিক পাওনা। শিক্ষক, মা বাবা কেউই বুঝতে পারেনি যে সে শিক্ষণে অক্ষমতা, ডিসলিয়ায় ভুগছিল। বাবা স্কুলের ফলাফলে অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে পাঠালেন এক বোডিং স্কুলে। সেখানে অবস্থার কোন উন্নতি তো হলই না বরং তার ভাগ্যে জুটল আরও কঠিন মানসিক অত্যাচার। পরবর্তীতে এক নতুন আর্ট শিক্ষক নিকুম্ভের প্রবেশ তার জীবনে।খৃবই দ্রুত তিনি বুঝতে পারলেন যে ইসহান এর প্রয়োজন ডিসলিয়া উপশমের প্রয়োজনীয় আন্তরিক সাহায্য। সম্ভব সবকিছুই তিনি করলেন। স্কুলের আর্ট প্রতিযোগীতার ইসহান পেল প্রথম পুরষ্কার। তার জীবনে এল পরিবর্তন। সবার আদর ভালবাসা পাওয়া শুরু হল। তার জীবন হয়ে উঠল সুখের আনন্দের। পাঠক এই হল সংক্ষেপে তারি জামিন পার ছবির গল্প। শিক্ষণে অক্ষমতা নিয়ে সমসাময়িক সময়ে অনেক সিনেমা হচ্ছে। হলিউডের ছবি দি রেইনম্যান- একজন অটিস্টিককে নিয়ে, মোজার্ট এন্ড দা ওয়াল- এসপারজার সিনড্রোমের (অটিজমের এক ধরন) এক বালক ও বালিকাকে নিয়ে, কিলার ডিলার- এক অটিস্টিক পিয়ানো বাদককে নিয়ে, দি বয় হু কোড ফ্লাই- এক অটিস্টিক টিন এজারকে নিয়ে, মারকারি রাইজিং- ৯ বছরের এক জিনিয়াস অটিস্টিক বালক- যে বিভিন্ন কোড ভাঙতে পারে, ডেভিডস মাদার- এক অটিস্টিক বালকের মায়ের সংগ্রাম নিয়ে ছাড়াও অসংখ্য সিনেমায় এ সমস্যার উপর আলোকপাত করা হয়েছে। বলিউডের ছবি তারি জামিন পার ছাড়াও সাড়া জাগানো মাই নেইম ইজ খান- এসপারজার সিনড্রোম নিয়ে, এক অটিস্টিক কিশোরী নিয়ে টিভি সিরিয়াল আপ কা অন্তরা সমস্যার দিকে আলোকপাত ও তার গভীরতা, সমাধানের উপায় নিয়ে তৈরী করা হয়েছে।

বাংলাদেশ জনসংখ্যার দিক থেকে রাশিয়া বা জাপান থেকেও গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। জনসম্পদই হল আমাদের প্রধান হাতিয়ার- যা দিয়ে প্রতিযোগীতার মধ্যে আমাদের টিকে থাকতে হবে। প্রশ্ন উঠে যেখানে আমরা ৯৮% শিশুর জন্য ফলপ্রসু কিছুই করতে পারছি না সেখানে মাত্র ১%-২% এর জন্য উদ্বিগ্ন থাকার কি কারণ থাকতে পারে? প্রথমত অন্যসব স্বাভাবিক শিশুদের মত এসব শিশুদের অধিকার আছে প্রয়োজনীয় শিক্ষা লাভের, দ্বিতীয়ত একজন অটিস্টিক শিশুর জন্য একটি পরিবারের কমপক্ষে ৭-৮ জন সদস্যের জীবনের স্বাভাবিক কর্মকান্ড ব্যাহত হয়, জাতীয় উন্নয়নে তাদের অবদান বাধাপ্রাপ্ত হয়। তৃতীয়ত, এসব শিশুরা যে অবদান রাখতে পারত তা থেকে জাতি বঞ্চিত হয়। আমাদের দেশের অসংখ্য শিশুর ভাগ্যে ঘটে ইসহান এর মত অবজ্ঞা, অবহেলা। কারণ আমাদের অজ্ঞতা। আমরা মা বাবারা তো নয়ই শিক্ষকরা পর্যন্ত এ বিষয়ে সম্পূর্ণ বেগাফিল। শিক্ষকরা এসব শিশুদের ব্যাপারে নৈরাশ্যজনক মন্তব্য তো করে থাকেনই স্কুলে আশ্রয়টুকুও দিতে চান না। অথচ প্রয়োজনীয় সাহায্য ও সহযোগীতা পেলে অসম্ভব কিছু না হলেও জীবনের প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও দক্ষতাটুকু এরা অর্জন করতে পারতো। বাস্তবে আমাদের দেশে এরকম সহযোগীতা পাওয়ার কোন উপায়ই নেই। ঢাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে ২-৪ টি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও একেতো শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে এছাড়াও এসব স্কুলের ফিস সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাহিরে। দেশের ২% শিশু ও যদি অটিস্টিক আক্রান্ত হয়, তবে এ বিরাট সংখ্যার শিশুদের শিক্ষার কোন সুযোগ এসব প্রতিষ্ঠানের কল্পনারও বাহিরে। তাই প্রয়োজন এ ব্যাপারে সবার এগিয়ে আসা। বিশেষভাবে স্বাভাবিক স্কুলের শিক্ষক, কর্তৃপক্ষ যদি এসব ছাত্রদের একটু আশ্রয় দেন, শ্রেণী শিক্ষকরা যদি অন্যান্য ছাত্রদের সাথে প্রত্যেকটি ক্লাসের ২/১ টি সমস্যাগ্রস্থ ছাত্রদের প্রতি একটু সহানুভূতি প্রদর্শন করেন, তাদের সাধ্যমত কাজের বোঝা দেন, এবং সহযোগীতা প্রদানের প্রয়োজনীয় অল্প স্বল্প লেখা পড়া করেন তবেই তাদের প্রতি কিছুটা দায়িত্ব পালন করা হবে। মনে রাখতে হবে এসব শিশুদের জন্য তাদের বাবা মা দায়ী নন। এসব মা বাবার কষ্ট কিছুটা অনুধাবন করার চেষ্টা করা নৈতিক কর্তব্য মনে করতে হবে। মনে রাখবেন আল্লাহ তায়ালা যে কাউকেই এ ধরনের পরীক্ষায় ফেলতে পারেন।

যেহেতু বেশীরভাগ সময় এসব শিশু মা বাবার কাছে থাকে। সেহেতু এদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদানে তাদেরকেই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। মা বাবার প্রশিক্ষণে সরকারী উদ্যোগ সর্বাধিক প্রয়োজন। কিন্তু সরকারী উদ্যোগ কবে হবে তার জন্যতো বসে থাকলে এরই মধ্যে অনেক দেরী হয়ে যাবে। তাই ভুক্তভোগীদের এগিযে আসা দরকার। ভারতের মেরী বড়ুয়া গড়ে তুলেছেন একশান ফর অটিজম নামক বিরাট প্রতিষ্ঠান, ঢাকার সোয়াক এরকম ভুক্তভোগদেরই অবদান, চট্টগ্রামেও শিশু একাডেমীর সহযোগীতায় ও অটিস্টিক পেরেন্টসদের উদ্যোগে বিরাট প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সিলেটের মত দেশের অন্যান্য এলাকার শত শত শিশু এ ধরনের সব সহযোগীতা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। সামর্থ্যবান দু একজন বাচ্চাদের বিদেশে পাঠিয়েছেন। বাকীরা মানসিক কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এসব মা বাবাদেরকেই এগিয়ে আসা প্রয়োজন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যদি একটি ট্রেনিং সেন্টার গড়ে তুলা সম্ভব হয় তবে সকলেই উপকৃত হবে। কেউ কেউ প্রতিষ্ঠানের মান নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারেন। এখানে মানসম্মত একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কোন শিক্ষকই নেই। আমি মনে করি এসব শিশুরা প্রত্যেকেই স্পেশাল। বর্তমানে অনুসৃত সবার জন্য সমানভাবে ফলপ্রসূ নয়। এখনও উপযুক্ত পদ্ধতির জন্য গবেষণা চলছে। মেধাবী শিক্ষকরা এসব শিশুদের নিয়ে যখনই চিন্তা করা শুরু করবেন- তখনই এদের মধ্যে কেউ উপযুক্ত পদ্ধতি আবিষ্কার করতেও পারেন। আর যে সব প্রশিক্ষণ এদের দেয়া সম্ভব তা প্রদান করলে এসব শিক্ষকদের মান উন্নয়ন করা যেতে পারে। বর্তমানে অনলাইনে এ ধরনের অনেক মেটেরিয়ালস ও প্রশিক্ষণ সামগ্রী পাওয়া যায় যেগুলো ব্যবহার করতে পারলে বিশ্বমানের ট্রেনিং দিতে সমস্যা থাকার কথা নয়। মাঝে মাঝে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে ও ওয়ার্কশপের আয়োজন পেরেন্টদের ও শিক্ষকদের সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগনেয়া যেতে পারে।

উদ্যোগ পেরেন্টসদের পক্ষ থেকে আসলেও তা বাস্তবায়নে শিশু উন্নয়নের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান যেমন শিশু একাডেমী ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সহযোগীতা প্রয়োজন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসব শিশুদের উন্নয়নে সরকারী অঙ্গীকারের কথা ব্যক্ত করেছেন। অঙ্গীকারের বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবার প্রয়োজনীয় সহযোগীতা প্রদানে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। অধিকাংশ পেরেন্টসদের সীমিত সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে সামর্থ্যবান পেরেন্টস, দানশীল ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানসমূহকে সহযোগীতার হাত প্রশস্ত করা দরকার।

সচেতনতা সৃষ্টিতে প্রচারমাধ্যমের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রচারমাধ্যমের নিবেদিত কর্মীবাহিনীর আন্তরিকতা এ বিষযে যথেষ্ট সাহায্য করতে পারে। কোন ব্যক্তি. গোষ্ঠি বা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ সামান্য হলেও তা যদি প্রচার মাধ্যমের কভারেজ পায় তবে ভবিষ্যতে বড় ধরনের উদ্যোগ আসার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হবে।

সিলেটসহ অন্যান্য স্থানের অটিস্টিক শিশুদের কল্যাণে সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠা অনেক মা বাবার অবিরাম ঝরা অশ্রু নিবারনে ভুমিকা রাখবে এই প্রত্যাশা রেখে বহুদিনের প্রত্যাশিত এ লেখাটির আপাতত সমাপ্তি টানছি।

[আব্দুল লতিফ, রেজিস্টার, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি]

No Comments to “অটিস্টিক শিশুদের জন্য ভালবাসা”

Comments are closed.