ইতিবাচক চিন্তাই সফলতার মূল



  • Add Comments
  • Print
  • Add to Favorites

ইমন চৌধুরী :

নিজেকে সফল ব্যক্তি হিসেবে চিন্তা করুন,
কাজের পেছনে ছুটুন সফলতার পেছনে নয়;
সফলতার পেছনে ছুটতে হবে না,
দেখবেন সফলতা আপনার হাতের মুঠোয় এসে ধরা দেবে।

আজ আমার জীবনের কিছু সফলতার সারমর্ম লিখছি :
২০১১ সালের প্রথম দিক, এস এস সি পরীক্ষা দিয়ে অবসরে ছিলাম, চিন্তা করছিলাম রেজাল্ট এর আগের সময়টা হয়তো বেড়াতে বেড়াতে কেটে যাবে, কিন্তু তা আর হল না, চাচা তার অফিসে কাজে লাগিয়ে দিলো। আমাকে তার অফিসের IT অপারেটর, কাস্টমার কেয়ার এবং একাউন্টস এর দায়িত্ব ঘাঁড়ে চাপিয়ে দিলো। কম্পিউটার চালনায় দক্ষতা থাকায় সকল কাজ বেশ ভালোভাবেই বুঝে নিলাম। তবে আমি অঙ্কতে কাঁচা থাকায় একাউন্টস এর কাজ ভালোভাবে করতে পারতাম না। কোন না কোন ঝামেলা পাকিয়ে ফেলতাম হিসেবে। এভাবে কেটে গেল কয়েক মাস, IT তে আমার দক্ষতায় বেশ প্রশংসা ও জনপ্রিয়তা কুড়োতে লাগলাম ঐ অফিসে। এক সময় এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দিলো। A+ কপালে জুটলো না, A গ্রেড নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হলো। এরপর মাথায় টেনশন ঢুকলো কোথায় ভর্তি হবো, অবশেষে কূল কিনারা না পেয়ে এইচ এস সি করার জন্য পুরান ঢাকার সোহরাওয়ার্দী কলেজে ভর্তি হলাম। কিছুদিন পর আই এইচ টিতে মেডিকেল টেকনোলজী কোর্সে সার্কুলার হল। চাচা পেশায় ফার্মাসিষ্ট। উনি আমাকে বললেন আই এইচ টি তে গিয়ে ফরম তুলতে। ফিজিওথেরাপি সাবজেক্ট তিনি সিলেক্ট করে দিলেন। তখন এই বিষয়টি সম্পর্কে আমার নূনতম জ্ঞান ছিল না। ভর্তি পরীক্ষা দিলাম, কয়েক হাজার স্টুডেন্টদের মধ্যে পঞ্চাশ জনের মধ্যে আমার স্থান হয়ে গেল। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, বিনা প্রস্তুতিতে কিভাবে চান্স পেয়ে গেলাম!

সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে ভর্তি বাতিল করে ভর্তি হলাম ঢাকা আই এইচ টি তে। পরে ক্লাস শুরু হল ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে, চাচার অফিস থেকে অবসর নিলাম পড়ালেখার জন্য। এরপর দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেল প্রথম বছর। দ্বিতীয় বছরে এসে ভাল একটি মোবাইল কিনলাম, তখন তো জাভার যুগ, Android অতটা প্রচলিত ছিল না, নিয়মিত ফেইসবুক চালানো শুরু করলাম।
এক সময় গুগলে সার্চ দিয়ে দেখি আমাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য অনলাইনে তথ্য পাওয়ার মত অতটা নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট বা ফেইসবুক ফ্যানপেইজ নেই বললেই চলে।

২০১৩ সালের মার্চ মাস। অনেকটা শখের বশে খুলে ফেললাম Institute of Health Technology, Dhaka নামের একটি ফেইসবুক ফ্যানপেইজ। আমাদের ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ছবি, নোটিশ, জানা অজানা মেডিকেল জগতের বিভিন্ন তথ্য পোস্ট করতে থাকলাম পেইজে। আস্তে আস্তে পেইজের ফ্যান বাড়তে লাগলো। বর্তমানে এসে এই পেইজটি এখন মেডিকেল টেকনোলজী এবং আই এইচ টির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পেইজ, যেখানে আমাদের মেডিকেল টেকনোলজীর বিভিন্ন খবরাখবর সবার আগে এবং নির্ভুলভাবে পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে কোন প্রকার প্রমোট ছাড়াই এই পেইজের লাইক সংখ্যা ছয় হাজারের বেশি।

পেইজের কাজ করতে করতে অনেকটা নেশায় ধরে গেল, এর কিছুদিন পর আরো একটি পেইজ খুললাম Medical Science “চিকিৎসা বিজ্ঞান” নামে। বিভিন্ন চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিষয়ক পোস্ট শেয়ার করতে শুরু করলাম এই পেইজে। শুরু থেকেই ব্যাপক সাড়া পেলাম। বর্তমানে এই পেইজের ফ্যান দশ হাজারের বেশি। অনেকই এই পেইজে জানা অজানা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারছে।

২০১৩ সালের অক্টোবর মাস। চিন্তা করছিলাম আমাদের অবহেলিত মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট জাতিকে জাগ্রত করার লক্ষ্যে একটি প্লাটফর্ম তৈরী করা, যেখান থেকে সবাই শুধুমাত্র নিজেদের ব্যাপারে সচেতন হবে, এবং মেডিকেল টেকনোলজীর সকল খবরাখবর পাবে। তখনই আমার এক জুনিয়র ছোট ভাই “আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ নোমান” (ফার্মেসি অনুষদ, আই এইচ টি, ঢাকা) একটি পেইজ খুলে ফেলল Bangladesh Medical Technology & Pharmacy Students Association – BMTPSA নামে। পরে আমাকে এডমিনের দায়িত্ব দেয়ার পর আমরা যৌথভাবে কয়েকজন এই পেইজে বিভিন্ন তথ্য দেয়া শুরু করলাম। অল্প দিনে ব্যাপক আকারে আমাদের ফ্যান এর সংখ্যা বাড়তে লাগলো। এরপর ঢাকা আই এইচ টি তে মেডিকেল টেকনোলজী স্টুডেন্টদের জন্য একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হল এই পেইজের নামানুসারেই। বিভিন্ন মিটিং, আন্দোলন কর্মসূচী, মানববন্ধন, উৎসাহমূলক লেখা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমরা পোস্ট করতে শুরু করলাম পেইজে। একটা সময় আমাদের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা বজ্রপাতের মত আকার ধারণ করলো। সারা বাংলাদেশের মেডিকেল টেকনোলজি শিক্ষার্থী এবং পেশাজিবীরা এক হতে শুরু করলো। সরকারের কাছে আমাদের বিভিন্ন দাবী নিয়ে সবাই একযোগে মাঠে নামলো। একসংগে সারা বাংলাদেশ কাঁপিয়ে দিলো মেডিকেল টেকনোলজী শিক্ষার্থীরা। যার ফলশ্রুতিতে এখন আমাদের জাতির সবাই কমবেশি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন। মেডিকেল টেকনোলজী সম্পর্কিত সকল তথ্য পাওয়ার জন্য আমাদের পেইজের উপর অনেকেই নির্ভর করে থাকে।

আস্তে আস্তে আমার আশা আকাঙ্খা বেড়েই চললো। এক সময় আই এইচ টি জন্য একটি ব্লগ সাইট তৈরি করলাম, যেখানে আমাদের ক্যাম্পাস সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য দেয়া আছে। ওয়েবসাইটি হল- www.ihtdhaka.blogspot.com

আমাদের অনলাইন কার্যক্রম ব্যাপক হতে ব্যাপকতর হতে লাগলো। একটা সময় ফিজিওনিউজ২৪.কম এর সম্পাদক “সৈয়দ শামীম আহসান মারুফ” ভাই এর সাথে পরিচয় হলো। তিনি আমার অনলাইন দক্ষতা দেখে এবং একজন ফিজিও পরিবারের সদস্য হওয়ায় আমাকে শুরু থেকেই অনেক বিশ্বাস এবং আমার প্রতি তার আস্থা অর্পন করলেন। বলার সাথে সাথেই 2014 এর ডিসেম্বরে আমাকে বাংলাদেশের প্রথম ফিজিওথেরাপি বিষয়ক পত্রিকা www.physionews24.com এর এডমিন করে দিলেন। উনি সহজে কাউকে মূল পোর্টালে কাজ করার সুযোগ দেন বলে মনে হয় না। তবে আমাকে কেন জানি প্রথম পরিচয়েই সেই মূল পোর্টালে এডমিন আইডি খুলে দিলেন। আস্তে আস্তে পোর্টালে বিভিন্ন লেখা দিতে লাগলাম। কিছুদিন পরই ফিজিওনিউজের ২য় বর্ষপূর্তি উৎসব পালিত হল ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে। অনেক দায়িত্বসহকারে সেদিনের কার্যক্রম সফল করলাম নিজ আগ্রহে। সেদিন থেকেই ফিজিওনিউজের মারুফ, সাব্বির, পার্থ ভাইদের সাথে ক্লোজ হতে লাগলাম। বর্তমানেও ফিজিওনিউজের সকল কার্যক্রমে একটিভ ভাবে থাকার চেষ্টা করছি। এবং বিভিন্ন কাযে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার চেষ্টা করে আসছি।

এবার বলি আমার সবচেয়ে প্রিয় এবং মানবিক কাজের কথা।
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মসে অনেকটা শখের বশেই ফেইসবুকে একটি পেইজ খুলি “Donate Blood, Save Life – “রক্ত দিন, জীবন বাঁচান” নামে। বর্তমানে এটিকে রূপ দিলাম Arpan Blood Foundation – অর্পণ ব্লাড ফাউন্ডেশন হিসেবে। এই পেইজের বর্তমান ফ্যান নয় হাজারের বেশি। গত এক বছরে কত মানুষের রক্ত ম্যানেজ করে দিয়েছি এই পেইজের মাধ্যমে তার কোন হিসাব আমার কাছে নেই। নিজেও জীবনে এ পর্যন্ত ১২ বার রক্তদান করেছি। যাদের উপকার করেছি, তাদের দোয়ায় আমি আজ ভালোভাবেই জীবনযাপন করছি।

এখন আমি আরো বড় স্বপ্ন দেখা শুরু করেছি এ কার্যক্রম নিয়ে। আমার স্বপ্ন এদেশের বিভিন্ন রোগির রক্তের প্রয়োজনে আর মানুষকে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না, রোগির চেয়ে রক্তদাতার সংখ্যা বেশি হবে। ভবিষ্যতে Arpan Blood Foundation – অর্পণ ব্লাড ফাউন্ডেশন এর মাধ্যমে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চাই। যেখান থেকে রোগিরা বিনা খরচে নিরাপদ রক্ত পাবে। ১ বছর যাবৎ শুধুমাত্র অনলাইনে কাজ করার পর এখন অফলাইনে আরো নতুন উদ্যমে কাজ করার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু করে দিয়েছি।

Arpan Blood Foundation – অর্পণ ব্লাড ফাউন্ডেশন বিভিন্ন পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে :
* বিনামূল্যে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচী।
* বিভিন্ন কলেজ, ইউনিভার্সিটি, জেলাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্পেইন।
* বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসে সচেতনতামূলক কর্মসূচী।
* দেশের স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের একত্রিত করে তাদের অমূল্য ত্যাগের স্বীকৃতি প্রদান।
* দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিজস্ব ল্যাব স্থাপন, যেখানে রক্তদাতারা রক্তদান করবে এবং রোগিদের প্রয়োজনে তা বিনামূল্যে দেয়া হবে। ইত্যাদি।

এবার আসি আমার পেশাগত কাজের কথায়।
আমি পেশায় একজন ফিজিওথেরাপিস্ট।
২০১৫ সালের মার্চ মাসের ঢাকা আই এইচ টি হতে ডিপ্লোমা ইন ফিজিওথেরাপি ফাইনাল পরীক্ষায় পাশ করার পর “ভিশন ফিজিওথেরাপি এন্ড রিহ্যাব সেন্টার, উত্তরা, ঢাকা” নামক প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করি। প্রথম প্রথম নিজের প্রতি অতটা আস্থা ছিল না যে, আমার দ্বারা রোগিরা সুস্থ হবে।
কয়েক মাস যেতে না যেতেই দেখলাম আমার ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে কয়েকজন রোগি সুস্থ জীবনে ফিরে যেতে শুরু করেছে। এমনও কিছু রোগি দেখেছি, যারা বিভিন্ন ডাক্তারের কাছে গিয়েও সুস্থ হয়নি, কিন্তু আমাদের প্রতিষ্ঠানে এসে আমার শ্রদ্ধেয় স্যার ডা. সাইফুল ইসলাম এর তত্বাবধানে আমার ফিজিওথেরাপিতে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। সেসব রোগিরা সুস্থ হয়ে মন থেকে দোয়া করছেন আমার জন্য। এ যেন এক অন্য রকম আনন্দ। ফিজিওথেরাপি যে এত বড় মহৎ পেশা তা আমার জানা ছিল না। আল্লাহর রহমতে আমার অফিসে দায়িত্বের সাথে কাজ করে আসছি, এবং সিনিয়রদের প্রশংসা ও আস্থা অর্জন করছি। ইনশাআল্লাহ আমার শ্রম ও আন্তরিকতা দিয়ে ভবিষ্যতেও কাজ করে যাবো।

পরিশেষে বলতে চাই, সফলতার পেছনে ছুটলে সফলতা আসে না। মানুষকে কাজের পেছনে ছুটতে হয়, ভাল কাজের মাঝে থাকলে সফলতা এসে ধরা দেয়। জীবনে চলার পথে অনেক সময় অনেক বাধা আসতে পারে, প্রত্যেকটি বাধা একেকটি শিক্ষা। সেসব বাধা থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়, ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে। স্বপ্ন দেখেতে হবে। একটি লক্ষ্য স্থির করতে হবে এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যেতে হবে। একটা সময় সেই লক্ষ্য আপনি কখন যে অতিক্রম করে ফেলবেন টেরই পাবেন না।

বি:দ্র: আমার লেখাটার মূল উদ্দেশ্য আমার নিজের গুণকির্তন গাওয়া নয়। আমার লেখাটি আমি তাদের প্রতিই উৎসর্গ করছি, যারা অল্প কিছু বাধায় ঝিমিয়ে পড়েন। স্বপ্ন দেখতে ভয় পান, স্বপ্ন পূরণ না হওয়ার ভয়ে।
ইতিবাচক চিন্তা করুন, নিরাশাবাদী মনোভাব ত্যাগ করুন। প্রতিদিন নিজেকে একটি কথা স্বরণ করিয়ে দিন, মানুষ জন্ম থেকেই বিজয়ী। নিজেকে বলুন আমি সফল, আমি সব পারি, আমাকে দিয়েই কিছু হবে। আমিই এ বিশ্ব জয় করবো।
দেখবেন, আপনার শরীরে এবং মনে এমন এক শক্তি সঞ্চিত হবে, যা পৃথিবীর সকল শক্তিকেই হার মানাবে।

Follow Your Dreams, Your Dreams Will Come True…!!!

ধন্যবাদ সবাইকে।

সাখাওয়াত হোসেন চৌধুরী (ইমন)
ফিজিওথেরাপিস্ট
ভিশন ফিজিওথেরাপি এন্ড রিহ্যাব সেন্টার, উত্তরা, ঢাকা।




No Comments to “ইতিবাচক চিন্তাই সফলতার মূল”

Comments are closed.