ইসলামে প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও করণীয়



  • Add Comments
  • Print
  • Add to Favorites

শারীরিকভাবে অসম্পূর্ন মানুষদের প্রতি সহমর্মিতা ও সহযোগীতা প্রদর্শন ও তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান ও মূল্যায়নের উদ্দেশ্যেই এই দিবসটির সূচনা। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৯২ সাল থেকে প্রতি বছর ৩ ডিসেম্বরকে বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস হিসেবে পালন করা হয়। উন্নত ও সুখী সমাজ বিনির্মাণে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে জ্ঞানের প্রতিটি বিভাগে যোগ্য করে গড়ে তুলতে ‘টেকসই উন্নয়ন : প্রযুক্তি প্রসারণ’ প্রতিপাদ্যে পালিত হচ্ছে ২৩তম আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস ও ১৬তম জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস।

মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা জীব। আল্লাহ তাআলা মানুষকে দিয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ জ্ঞান। যা অন্যকোন প্রাণীকে দেয়া হয় নাই। তাইতো মানুষ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে সমতা বিধান করবে। কুরআন ও হাদিসে এসেছে সাম্যের সবিস্তার আলোচনা। যার মধ্যে সব ধরনের প্রতিবন্ধীরাও শামিল। এ প্রতিবন্ধী মানুষ কেউ জন্মগতভাবে হয় আবার কেউ নানা দুর্ঘটনা ও অসুস্থতার কারণেও হয়। সব ধরনের প্রতিবন্ধীর সঙ্গে উত্তম আচরণ, তার উপকারে হাত বাড়িয়ে দেয়ার শিক্ষাই রয়েছে কুরআন ও হাদিসে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনিই মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছা তোমাদের আকৃতি গঠন করেন।’ (সুরা ইমরান : আয়াত ৬) প্রতিবন্ধীদের কথা আসলেই সুরা আবাসার সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে উত্তম আচরণ কর।

ADD-Care4u-Sticker

তাফসিরে কবিরে এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু আনহু যিনি বনি আমের ইবনে লুইয়ের গোত্রভুক্ত ছিলেন। একদা তিনি হজরত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে এমন সময় হাজির হন, যখন তিনি মক্কার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ওতবা ইবনে রবিয়া, আবু জেহেল, আব্বাস ইবনে আবুল মোত্তালেব, উবাই ইবনে খলফ এবং উমাইয়া ইবনে খলফের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের জন্যে আহবান করছিলেন এবং তিনি আশা করছিলেন যে, তারা মুসলমান হয়ে যাবে। ঠিক এমন সময় অন্ধ সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু আনহু বারবার এ কথা বলছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহ আপনাকে যা শিখিয়েছেন, তা আপনি আমাকে শিখিয়ে দিন।’ যেহেতু তিনি অন্ধ, তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন না রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কার সঙ্গে কথা বলছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমের কথার কারণে আলোচনার ব্যঘাত ঘটছিল। এ কারণে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা মুবারাকে একটু বিরক্তির ভাব প্রকাশ পেয়েছিল,  তখন আল্লাহ তাআলা আয়াত নাজিল করেন-

তিনি ভ্রূকুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কারণ, তাঁর কাছে এক অন্ধ আগমন করল। আপনি কি জানেন, সে হয়তো পরিশুদ্ধ হত, অথবা উপদেশ গ্রহণ করতো এবং উপদেশ তার উপকার হত। পরন্তু যে বেপরোয়া, আপনি তার চিন্তায় মশগুল। সে শুদ্ধ না হলে আপনার কোন দোষ নেই। যে আপনার কাছে দৌড়ে আসলো এমতাবস্থায় যে, সে ভয় করে, আপনি তাকে অবজ্ঞা করলেন। কখনও এরূপ করবেন না, এটা উপদেশবানী। (সুরা আবাসা : আয়াত ০১-১১) এরপর থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিবন্ধীদের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করেন এবং তাদের প্রতি ভালোবাসা বাড়িয়ে তাদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে থাকেন। প্রতিবন্ধীদের প্রতি ভালোবাসা দেখানো এবং সাহায্য সহযোগিতা করা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উত্তম আদর্শ। তিনি কর্মে তার বাস্তবায়ন করেছেন।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমাজের সব শ্রেণীর মানুষকে সমান চোখে দেখতেন। যার প্রমাণ বহন করে হজরত বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বাকপ্রতিবন্ধী হওয়া সত্বেও মসজিদে নববীর প্রথম মুয়াজ্জিনের মর্যাদা লাভের মাধ্যমে।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখনই অন্ধ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমকে দেখতেন, তখন তাকে বিশেষ মর্যাদা দিতেন এবং বলতেন স্বাগতম সেই ব্যক্তির জন্যে, যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা আমাকে সতর্ক করেছেন। অতপর তাঁর কোনো প্রয়োজন আছে কিনা তিনি খোঁজ-খবর নিতেন।

হজরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু’বার জিহাদে গমন করার সময় আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে গেছেন। মসজিদে নববিতে তিনি তেরবার নামাজের ইমামতি করেছেন। (তিরমিজি ও মুস্তাদরেকে হাকিম)

মানুষ হিসেবে প্রতিবন্ধীদের স্বাভাবিক চলাফেরা জীবন-যাপন করার অধিকার রয়েছে এবং ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের সবারই প্রতিবন্ধীদের অধিকারের প্রতি বিশেষভাবে নজর দেওয়ার দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। কেননা প্রতিবন্ধী নারী, শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের বৈষম্য ও দুঃখ-কষ্টের সীমা থাকে না। তাই ইসলাম দুর্বল, অসহায় ও প্রতিবন্ধীদের অধিকারের ব্যাপারে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে। প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ, পুনর্বাসন,  বিনোদন তথা কর্মসংস্থান লাভের পূর্ণ অধিকারের কথা বলা হয়েছে। প্রতিবন্ধীদেরকে পরনির্ভরশীল না হয়ে আত্মনির্ভরশীল হতে, দক্ষ কর্মীরূপে গড়ে তুলতে, সমাজের সর্বস্তরের লোকদের ইতিবাচক ভূমিকা পালন করা ঈমানি দায়িত্ব।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, বান্দা যতক্ষণ তার ভাইকে সাহায্য করে, আল্লাহ ততক্ষণ বান্দাকে সাহায্য করে থাকেন।’ (মুসলিম) তিনি আরও বলেছেন, ‘তোমরা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দাও, অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ-খবর নাও এবং বন্দীকে মুক্তি দাও।’ (বুখারি)

সুতরাং সামর্থ্য অনুযায়ী স্থান কাল পাত্রভেদে প্রত্যেকে স্ব স্ব অবস্থানে থেকে প্রতিবন্ধীদের প্রতি সার্বিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে কুরআন ও হাদিসের ওপর আমল করে প্রতিবন্ধীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় একত্রিত হই। এ কর্ম সম্পাদনে আল্লাহ আমাদের কবুল করুন। আমিন।

সূএ/জাগোবিডি

No Comments to “ইসলামে প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও করণীয়”

Comments are closed.