একজ়িমার সমস্যা এবং চিকিৎসা

0
50

একজ়িমা কী? কী থেকে হতে পারে এই সমস্যা? এর চিকিত্‌সাই বা কী? একজ়িমা বা ডর্মাটাইটিস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় ডা. সঞ্জয় ঘোষ।
– – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – –

ত্বকের প্রদাহকে একজ়িমা বা ডার্মাটাইটিস বলা হয়। যেকোনও বয়েসেই এই রোগ হতে পারে। একজ়িমার আবার নানা ভাগ রয়েছে। ৮০% ক্ষেত্রে একজ়িমা সেরে যায়। আর বাকি ২০% ক্ষেত্রে ওষুধের মাধ্যমে এই অসুখ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। মনে রাখবেন, একজ়িমা কিন্তু একেবারেই ছোঁয়াচে নয়।

বিভিন্ন ধরণের একজ়িমা

একজ়িমা বা ডর্মাটাইটিসকে প্রধাণত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এক্সটারনাল একজ়িমা এবং ইন্টারনাল একজ়িমা।

এক্সটারনাল একজ়িমা

বাইরের কোনও কারণ থেকে একজ়িমা হলে তাকে এক্সটারনাল একজ়িমা বা এক্সটারনাল ডর্মাটাইটিস বলা হয়। যেমন কোনও সাবান থেকে হতে পারে বা কোনও বিশেষ ধাতু থেকে সমস্যা হতে পারে। আবার অনেকের টিপ পরলেও সমস্যা হয়। মানুষের জিন নির্ধারণ করে দেয় কী থেকে তার সমস্যা হতে পারে।

এই এক্সারনাল একজ়িমারও কয়েকটি ভাগ আছে। সেগুলো হল—

কনট্যাক্ট ডর্মাটাইটিস

কোনও কিছুর কনট্যাক্ট বা ছোঁয়া থেকে এই ডর্মাটাইটিস হয়। এরও আবার দুটো ভাগ আছে। ইরিটেন্ট কনট্যাক্ট এবং অ্যালার্জিক কনট্যাক্ট। ডিটারজেন্ট, অ্যাসিড এবং অন্যান্য নানা জিনিসের ছোঁয়া থেকে যে ডর্মাটাইটিস হয় তাকে ইরিটেন্ট কনট্যাক্ট ডর্মাটাইটিস বলে। খুব বেশী জল ঘাটলেও এই ধরণের একজ়িমা হতে পারে। সেক্ষেত্রে বেরিয়ার ক্রিম ব্যবহার করুন। হালকা সাবান ব্যবহার করুন। অনেকের ধারণা থাকে অ্যান্টিসেপটিক সাবান বা ক্রিম লাগালে ত্বক ভাল থাকে। এই ধারণা ঠিক নয়।

নানা জিনিসে অ্যালার্জি থাকতে পারে। যেমন– নিকেল অ্যালার্জি থাকলে ঘড়ি পরলে, কানের দুলের পুশ থেকে বা চামড়ায় অ্যালার্জি থাকলে চামড়ার জুতো বা ব্যাগ নিলে সমস্যা হয়। সেই সমস্যা বেড়ে একজ়িমায় পরিণত হতে পারে। একে অ্যালার্জিক কনট্যাক্ট ডর্মাটাইটিস বলে। নিকেল অ্যালার্জি থাকলে চামড়ার ঘড়ি পরুন। কানের দুলে প্লাস্টিকের পুশ ব্যবহার করুন। চামড়ার বদলে কাপড়ের ব্যাগ নিন, জুতো পুরন।

মাউস ডর্মাটাইটিস

যাঁরা কম্পিউটারে কাজ করেন তাঁদের অনেক সময় মাউস ডর্মাটাইটিস হয়। এই অবস্থায় গ্লাভস পরে কাজ করতে পারেন। কিছুদিন পর পর মাউস বদলেও নিতে পারেন।

কসমেটিক ডর্মাটাইটিস

কসমেটিক থেকেও একজ়িমা হতে পারে। যেমনহেয়ার ডাই লাগালে গায়ে বা মুখে অ্যালার্জি হতে পারে। নেলপলিশ থেকেও অ্যালার্জি হয়। েক্ষেত্রে চোখে অ্যালার্জি হয়। তাছানা লিপস্টিক, নানা ধরণের আই কসমেটিক থেকেও সমস্যা হতে পারে। দামী বা বিদেশী ব্র্যান্ডের সঙ্গে এর কোনও সম্বন্ধ নেই। আপনার যে জিনিসে অ্যালার্জি আছে দেখে নিতে হবে কসমেটিকে সেই পদার্থটা আছে কিনা। অনেক সময় এক ব্যান্ডের অন্য শেডের কসমেটিক ব্যবহার করলেও এই সমস্যা হতে পারে। তাই নতুন কোনও কসমেটিক ব্যবহার করার ৩-৪ দিন হাতে লাগিয়ে দেখে নিন কোনও র্যাশ বেরোচ্ছে কিনা।

শীত কালের থেকে গরম কালে এই ধরণের একজ়িমা বেশী হয়। কারণ গরমে মেটাল বা সেই পদার্থটাকে ত্বকে প্রবেশ করাতে সাহায্য করে। স্প্রে থেকেও এই ধরণের একজ়িমা হতে পারে। এছানাও এখন নানা নতুন নতুন জিনিস থেকে একজ়িমা হয়। যেমন— সেলফোন। সেক্ষেত্রে মোবাইলে কথা বলার সময় মোবাইলে একটা প্লাস্টিকের জ্যাকেট লাগিয়ে নিন। অনেক ওষুধ বা অ্যান্টিসেপটিক থেকেও অ্যালার্জি হতে পারে।

ইন্টারনাল একজ়িমা

একে অ্যাটোপিক একজ়িমাও বলা হয়। বংশে হাঁপানি, অ্যালার্জি জনিত হাঁচি বা অন্যান্য অ্যালার্জির ধাত থাকলে এই সমস্যা দেখা যায়। রক্তে আইজিই নামক অ্যান্টিবডি বেশি থাকলে এই অ্যাটোপিক একজ়িমা হয়।

এছাড়া ইনফেন্টাইল, চাইল্ডহুড এবং অ্যাডাল্টহুড একজ়িমাও হয়। ইনফেন্টাইল একজ়িমায় বাচ্চার মুখে, মাথায় এবং শরীরের নানা অংশে র্যাশ বেরোয়। চাইল্ডহুড একজ়িমায় শরীরের খাঁজে এতজ়িমা হয়। অ্যাডাল্টহুড একজ়িমা শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হতে পারে। তার সঙ্গে হাঁপানি বা হাঁচিও হয়।

কী করে বুঝবেন কিসে অ্যালার্জি আছে

প্যাচ টেস্ট করলে জানা যায় কার কিসে অ্যালার্জি আছে। তাই চিকিত্‌সকের পরামর্শ নিয়ে প্যাচ টেস্ট করিয়ে নিন। চিকিত্‌সকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়ম মেনে চলুন।

সিম্পটম

ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া।

লাল হয়ে যাওয়া।

চুলকানো।

অনবরত রস বা পুঁজ পড়া।

জায়গাটা পুরু হয়ে যাওয়া।

চিকিত্‌সা

একজ়িমার তিন রকমের স্টেজে তিন ধরণের চিকিত্‌সা করা হয়।

অ্যাকিউট স্টেজ: এই সময় একজ়িমা থেকে অনবরত রস পড়তে থাকে। এই অবস্থায় একজ়িমার কারণ জেনে নিয়ে ত্বক শুষ্ক করার জন্যে লোশন মেডিকেটেড লাগাতে।

সাব-অ্যাকিউট স্টেজ: এই অবস্থায় একজ়িমা থেকে রস পড়ে না আবার পুরোপুরি শুকিয়েও যায় না। এই অবস্থার চিকিত্‌সার জন্যে মেডিকেটেড ক্রিম ব্যবহার করতে পারেন।

ক্রনিক স্টেজ: এই সময়ে ত্বক পুরু হয়ে যায়। ত্বক নরম করার জন্যে মেডিকেটেড অয়েন্টমেন্ট লাগাতে পারেন।

এছাড়া অ্যান্টই্যালার্জিক খেতে পারেন। বাইরে থেকে জীবাণুর সংক্রমণ ঘটলে অ্যান্টিবায়োটিক খেতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে স্টেরয়েড লাগানো বা খাওয়াও যেতে পারেন। তবে সব ক্ষেত্রেই চিকিত্‌সকের পরামর্শ নেবেন। আপনার অবস্থা অনুযায়ী তিনি বলে দেবেন কী করতে হবে।

কিছু পরামর্শ

তুলোর বালিশ, লেপ, কম্বল ব্যবহার করবেন না।

ধুলো থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করবেন।

গাছপালা, ঘাস, ফুলের রেণু থেকে দূকে থাকবেন।

পোশা কোনও প্রাণী বা পাখির কাছে বেশি থাকবেন না।

টোম্যাটো, বেগুন, ডিম, রসুন খাওয়া কমালে উপকৃত হবেন।

যতটা সম্ভব মৃদু সাবান, ক্রিম, সুগন্ধী ব্যবহার করুন।