একটানা বসে কাজ, ডেকে আনে সর্বনাশ



  • Add Comments
  • Print
  • Add to Favorites

শত্রু মেরে হাসি, কাজ সেরে বসি— রাজাধিরাজদের যুগের খুবই জনপ্রিয় একটি প্রবাদ-প্রবচন। কিন্তু সময়ের পালাবদলে মানুষের এখন আর কাজ শেষ করে বসার কোনো সুযোগ ও সময় নেই, বরং অনেকেই বসে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে অভ্যস্ত। সভ্যতার চরম উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার ধরনও যেমন পরিবর্তিত হচ্ছে, তেমনি তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে অনেক কাজ দিনকে দিন সহজ থেকে সহজতর হচ্ছে। কায়িক পরিশ্রমের তুলনায় টেবিলওয়ার্ক বা বসে বসে এক নিমিষেই প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কার্য সম্পাদন করার রীতি এখন আমাদের মজ্জাগত অভ্যাস। এমনকি দেখা যায়, অফিস আওয়ারের বাইরেও অধিকাংশ সময় বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক কাজে আমাদের টেবিল-চেয়ারে বসেই কেটে যায়। বিশেষ করে নির্দিষ্ট অনেক পেশাজীবী যেমন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ ড্রাইভার, সিকিউরিটি গার্ড বা দারোয়ান তাদের অধিকাংশ সময় বসে বসে কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। সোশ্যাল মিডিয়ার এ যুগে আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে বসে মোবাইলে ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইউটিউব বা টুইটারে মুখ গুঁজে পড়ে থাকেন, টেরও পান না সময় কীভাবে কেটে যায়। সুযোগের অভাবে হোক কিংবা যথাযথ পরিবেশের অভাবে হোক, শিশু বা বাচ্চারা এখন দীর্ঘক্ষণ একটানা শুয়ে-বসে ভিডিও বা গেমস খেলায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আবার আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন টিভি অনুষ্ঠান বিশেষ করে বিভিন্ন জনপ্রিয় টকশো, সিরিয়াল এমনকি দীর্ঘক্ষণ ধরে একের পর এক সিনেমা আরাম করে এক জায়গায় বসে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমরা হয়তো ভুলেই গেছি, যেখানেই আরাম সেখানেই ব্যারাম। তাই আসুন জেনে নিই এভাবে অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ বসে বসে অভ্যস্ত হওয়ার ফলে মনের অজান্তেই শরীর নামক এ দেহঘড়ির কী কী ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। প্রথমত সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হয় পিঠ, ঘাড়, কোমর ও হাঁটুর ব্যথায়। আপনি হয়তো জানেনই না, যে চেয়ারে বসে কাজ করেন সেটি আপনার অজান্তে আপনার কত বড় ক্ষতি করে দিচ্ছে। কারণ আমাদের মেরুদণ্ডের নির্দিষ্ট একটি আকার রয়েছে, যা কয়েকটি স্বাভাবিক বাঁকের সমন্বয়ে তৈরি। কোনো কারণে একটানা দীর্ঘসময় অস্বাভাবিক দেহভঙ্গিতে বসে থাকলে মেরুদণ্ড আর স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে না। ফলে লম্বা সময় ধরে ঘাড় কুঁজো করে মোবাইলে এবং কম্পিউটারে কাজ করলে কিংবা বসে বসে সময় কাটালে ঘাড়ে, পিঠে, কোমরে ও হাঁটুতে ব্যথাসহ দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা যেমন আর্থ্রাইটিস, স্পল্ডিলাইটিস ইত্যাদি রোগের সম্ভাবনা বাড়ে। আর এরকম ভুক্তভোগীর সংখ্যা ইতিমধ্যেই আমাদের চারপাশে কিন্তু দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে। তাই এখনই সতর্ক না হলে আগামীতে তা আরও বাড়বে। এ ছাড়া একদৃষ্টে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটার বা মোবাইলে কাজ করলে চোখের স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তিও ব্যাহত হয়। এ ছাড়া যারা দীর্ঘক্ষণ ঠায় বসে থাকেন তাদের পায়ে পানি চলে আসে, পায়ের পাতা ফুলে যায়। এমনকি ‘ভ্যারিকোস ভেইন’ নামক রোগের সম্ভাবনাও বেশি থাকে।

মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, ফলে বার্ধক্যজনিত রোগও বাড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ এখন নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ বা অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। এসব ব্যাধি কোনো রোগজীবাণুর কারণে হয় না, বরং পরিশ্রমহীনতাই এ ধরনের রোগ ডেকে আনে। কারণ দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করার কারণে দিনের অধিকাংশ সময় পরিশ্রমবঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন, ফলে কায়িক পরিশ্রমের অভাবজনিত রোগ নিজের অজান্তেই আহ্বান করছেন নিজের জীবনে। অলস জীবনযাপনের ফলে শরীরে স্বাভাবিক বিপাক ক্রিয়ায় প্রভাব পড়ে, চর্বি সঞ্চিত হয়ে বাড়ে শারীরিক স্থূলতা, রক্তের সুগারের মাত্রা, চর্বি বা কোলেস্টেরল। এসবের ফলস্বরূপ ডায়াবেটিস, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকিসহ নানা মানসিক সমস্যার সম্ভাবনা বাড়ছে। দিনের অধিকাংশ সময় যদি কেউ একটানা চেয়ারে বসে কাজ করেন তাহলে এসব সমস্যা ছাড়াও ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে বলে গবেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও মারাত্মক। যেসব শিশু ছোটবেলা থেকে কম্পিউটার বা মোবাইল গেমস, ইউটিউবে ভিডিও দেখার মতো অভ্যাসে আসক্ত হয়ে শৈশবকালীন খেলাধুলা বা ব্যায়ামসহ শারীরিক পরিশ্রমবিমুখ হয়ে বড় হয়, তাদের স্বাভাবিক শারীরিক গঠন ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে শিশুকালীন স্থূলতাসহ ভবিষ্যৎ জীবনে নানা অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম বয়সেই বাড়ে। বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে যেহেতু এভাবে কাজ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই সুতরাং কিছুটা সতর্ক হয়ে ছোট ছোট কিছু কাজকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে, যাতে করে বসে কাজের কারণে সৃষ্ট রোগগুলোর ঝুঁকি কমে।

টেবিলে কিছু সময় কাজ করার পর খানিকটা সময়ের জন্য একটু হাঁটাহাটির অভ্যাস করা ভালো। সম্ভব হলে লিফট ব্যবহার না করে হেঁটে ওঠানামার অভ্যাস করা উচিত। অফিসের খাবার বা চা-কফি কাজের চেয়ারে বসে না খেয়ে, অন্য কক্ষ বা ক্যান্টিনে গিয়ে খাওয়া যেতে পারে।

অর্থাৎ একটানা বসে থাকা এড়ানোর যত সুযোগ আছে সবই কাজে লাগাতে হবে। লক্ষ্য রাখুন যে চেয়ার টেবিলে বসে কাজ করছেন বা টিভি দেখছেন তার উচ্চতা এমন হতে হবে, যেন বসে আরাম হয়। ঘাড় বাঁকিয়ে বা নিচু করে দীর্ঘসময় কাজ করা বা মোবাইল ব্যবহার ঠিক নয়। তাই উচ্চতা অনুযায়ী উঁচু চেয়ার অথবা নিচু টেবিল বেছে নিন, প্রয়োজনে নির্দিষ্ট মাপ মতো তৈরি করে নিতে পারেন। গদিওয়ালা চেয়ারের তুলনায় কাঠ বা প্লাস্টিকের তৈরি চেয়ার শরীরের জন্য ভালো। কারণ গদিওয়ালা চেয়ারে বসে কাজ করার সময় মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে থাকার সম্ভাবনা বেশি থাকে। গাড়ির সিটে বসলে যেমন ঘাড়ের পিছনের অংশে ভারসাম্য রাখা যায়, অফিসের চেয়ারেও তেমন ব্যবস্থা থাকলে ভালো। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই থাকে না, তাই যেখানে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার প্রয়োজন পড়ে সে সময় ঘাড়ের পেছনে ছোট একটা বালিশ বা কুশনের মতো কিছু দিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করা যেতে পারে।

একটানা বসে কাজ করার সময় মাঝেমধ্যে পা রাখার জন্য টেবিলের নিচে কাঠের তক্তা রাখা দরকার। বিশেষ করে, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে যাদের পা ফুলে যায় তাদের এ পদ্ধতি নেওয়া একান্ত দরকারি। এ ছাড়া মাঝে মধ্যে পা দুটি টান করা, বসে বসে হাঁটু ভাজ করা, উঠে দাঁড়িয়ে দু-একবার উঠবোস করা উচিত। এর পাশাপাশি অফিস বা বাসার ভিতরেই নিয়মিত খানিকটা হাঁটাচলা করা দরকার। নিয়মিত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সকাল বিকাল হাঁটাহাঁটির অভ্যাস করতে হবে, উপায় না থাকলে স্বল্প দূরত্বে রিকশা বা ভ্যানের পরিবর্তে হেঁটে চলাচল অভ্যাস করা ভালো।

বাড়িতে মহিলা বা বয়স্ক ব্যক্তিরা এমনকি অন্য সবাই টিভিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিরিয়াল বা অন্যান্য বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখার সময় একটানা বসে না থেকে একটু ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ বা ঘরের মাঝেই স্বল্প পরিসরে হাঁটাহাঁটি করতে পারেন। যাদের দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটারে কাজ করতে হয়, চোখের সমস্যা না থাকলেও ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিরিফ্লেকটিং কোটিং বা আলোক প্রতিরোধী চশমা ব্যবহার করা ভালো।

ছোট শিশুদের মোবাইল, কম্পিউটার বা টেলিভিশনের প্রতি আকৃষ্ট না করে বাইরে খেলাধুলার ব্যাপারে উৎসাহিত করা এবং তার যথাযথ ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়, একেবারে ছোট বাচ্চাদের শান্ত রাখার জন্য হাতে মোবাইল বা ট্যাব তুলে দেওয়া হয়। এমনকি মোবাইলে কার্টুন বা ভিডিও দেখিয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে খাওয়া বা ঘুমানোর অভ্যাস করানো হয়, যা ভবিষ্যতে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ভয়াবহভাবে বাধাগ্রস্ত করে। তাই মা-বাবার উচিত তাদের পেছনে একটু বেশি সময় ব্যয় করে হলেও এসব অভ্যাস বা আসক্তি থেকে বাচ্চাদের দূরে রাখা। অন্যথায় তারাও অল্প বয়সেই অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে পারে।

পরিশেষে কর্মব্যস্ত জীবনে দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে ছুটে চলেছি আমরা সবাই, শরীর খারাপ না হওয়া পর্যন্ত নিজের দিকে তাকানোর সময় পর্যন্ত নেই আমাদের হাতে। কিন্তু একবার অসুস্থ হয়ে পড়লে তখন আমরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে হাসপাতাল কিংবা ডাক্তারের পিছু পিছু ছুটে চলি। এতে আমাদের শারীরিক, মানসিক ক্ষতির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক ক্ষতিও তো কম হয় না। তাই নিয়মিত শরীরচর্চা, কমবেশি হাঁটাচলা এবং কায়িক পরিশ্রমের সঙ্গে সঙ্গে পরিমিত সুষম খাদ্যগ্রহণ, সর্বোপরি সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার কমিয়ে পরিবার বা চারপাশের মানুষের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটানোর অভ্যাস করা উচিত, তাহলেই জীবন হয়ে উঠবে রোগমুক্ত সুস্থ, সুন্দর ও আনন্দের।

লেখক : ডিন, মেডিসিন অনুষদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

No Comments to “একটানা বসে কাজ, ডেকে আনে সর্বনাশ”

Comments are closed.