দীর্ঘস্থায়ী বাতের ব্যথা : রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস

0
49

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস রোগ সম্পূর্ণ ভালো হয় না, তাই চিকিৎসার শুরুতে রোগীকে রোগ সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। তবে এ কথা ঠিক, রোগের উপসর্গ দেখা দেয়ামাত্র চিকিৎসা শুরু করলে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং রোগের মারাত্মক ঝুঁকি যেমন পঙ্গুত্ব থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়। লিখেছেন ডা: মিজানুর রহমান কল্লোল

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ও অস্টিও আর্থ্রাইটিসের মধ্যে পার্থক্য

  • রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি অটোইমিউন রোগ এবং এটা সচরাচর প্রথম জীবনে হয়। অন্য দিকে অস্টিও আর্থ্রাইটিস একটি বয়স সম্পর্কিত রোগ, যা কার্টিলেজের ক্ষয় বা ছিঁড়ে যাওয়ার জন্য হয়।
  • রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস সাধারণত ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সের মধ্যে ঘটে থাকে, তবে এটা শিশুদেরও আক্রান্ত করে। তবে অস্টিও আর্থ্রাইটিস সাধারণত ৪০ বছরের বেশি বয়সী লোকদের আক্রান্ত করে।
  • রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে প্রায় সমানভাবে শরীরের দু’পাশের অর্থাৎ ডান ও বাম দিকের অস্থিসন্ধিগুলো আক্রান্ত হয়। অন্য দিকে অস্টিও আর্থ্রাইটিসে শরীরের পৃথক পৃথক অস্থিসন্ধি আক্রান্ত হয় অথবা প্রথম দিকে শরীরের শুধু এক পাশের অস্থিসন্ধিগুলো আক্রান্ত হয়।
  • রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত অস্থিসন্ধিগুলো লাল ও গরম হয় এবং ফুলে যায়। অন্য দিকে অস্টিও আর্থ্রাইটিসে অস্থিসন্ধিগুলো সাধারণত লাল ও গরম হয় না।
  • রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস অনেক অস্থিসন্ধিকে আক্রান্ত করে, সাধারণত হাত ও পায়ের ছোট ছোট জোড়াগুলো বেশি আক্রান্ত হয়। এটা কনুই, কাঁধ, কবজি, হিপ, হাঁটু ও গোড়ালির গাঁটকেও আক্রান্ত করে। অন্য দিকে অস্টিও আর্থ্রাইটিস সাধারণত শরীরের ওজন বহনকারী অস্থিসন্ধিগুলোকে এবং যেসব অস্থিসন্ধি বেশি ব্যবহৃত হয় (যেমন হাঁটু ও হিপ) সেসব অস্থিসন্ধিগুলোকে বেশি আক্রান্ত করে।
  • রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস শরীরের সব তন্ত্রকে আক্রান্ত করতে পারে। সেইসাথে সার্বিক অসুস্থতা বোধ হয় এবং অবসন্নতা দেখা দিতে পারে, শরীরের ওজন কমে যেতে পারে। অন্য দিকে অস্টিও আর্থ্রাইটিসে সাধারণত আক্রান্ত জোড়াগুলোতে অস্বস্তিবোধ হয়।
  • রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে সকালবেলা দীর্ঘ সময় আক্রান্ত জোড়াগুলো শক্ত থাকে। অন্য দিকে অস্টিও আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত জোড়াগুলো সকালবেলা অল্প সময় শক্ত থাকে।
  • রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে মারাত্মক অবসন্নতা দেখা দেয়। অন্য দিকে অস্টিও আর্থ্রাইটিসে তেমন অবসন্নতা দেখা দেয় না।

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসাপদ্ধতি হলো একটি সমন্বিত কার্যক্রম। এই টিমে রয়েছেন একজন রিউমাটোলজিস্ট বা বাতব্যথা রোগ বিশেষজ্ঞ, অর্থোপেডিক সার্জন, ফিজিও থেরাপিস্ট, অকুপেশনাল বা পেশাগত থেরাপিস্ট, অর্থোটিস্ট এবং সোস্যাল ওয়ার্কার বা সমাজকর্মী। রোগের বৈশিষ্ট্য ও স্তর অনুযায়ী এই টিমের একেকজনের একেক ভূমিকা রয়েছে।

চিকিৎসার উদ্দেশ্য

  • প্রদাহজনিত প্রক্রিয়াকে একেবারে কমিয়ে আনা। এর ফলে অস্থিসন্ধির নড়াচড়া সংরক্ষিত হবে, মাংসপেশি সবল ও সুস্থ থাকবে এবং অস্থিসন্ধির শক্ত হওয়া রোধ হবে ও অস্থিসন্ধি বিকলাঙ্গ হওয়া থেকে রক্ষা পাবে।
  • সংশ্লিষ্ট উপসর্গগুলো যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা।
  • সঠিক স্লিন্টয়ের মাধ্যমে সম্ভাব্য বিকলাঙ্গতা প্রতিরোধ করা।
  • কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপারেশনের মাধ্যমে বিকলাঙ্গতা ঠিক করা, ব্যথা নির্মূল করা এবং অস্থিসন্ধি দৃঢ় রাখা।

সাধারণ ব্যবস্থা
এটার উদ্দেশ্য হলো রোগীর সাধারণ অবস্থার উন্নয়ন এবং অস্থিসন্ধিকে স্থিতি রাখা। সাধারণ ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে :

  • পূর্ণ বিশ্রাম নেয়া। এটা ফোলা, ব্যথা ও অবসাদ দূর করতে সাহায্য করে।
  • ভালো খাওয়া-দাওয়া করা। প্রোটিন ও মিনারেলসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া।
  • রক্তস্বল্পতা থাকলে তা রক্ত পরিসঞ্চালন ও হেমাটিনিকের মাধ্যমে ঠিক করা।
  • অস্থির উন্নয়নে ইস্ট্রোজেন ও অ্যানড্রোজেন হরমোন মিশ্রণ গ্রহণ করা।
  • সংক্রমিত কেন্দ্রবিন্দু অপসারণ করা।

স্প্লিন্ট
স্প্লিন্টের প্রধান কাজ তিনটি :

  • অস্থিসন্ধিকে বিশ্রামে রাখা এবং ব্যথা লাঘব করা (রেস্ট স্প্লিন্ট)।
  • বিকলাঙ্গতা প্রতিরোধ করা ও সংশোধন করা (কারেকটিভ স্প্লিন্ট)।
  • ক্ষতিগ্রস্ত অস্থিসন্ধিকে কার্যকর অবস্থানে এনে স্থির করে দেয়া (ফিক্সেশন স্প্লিন্ট)।
    একটি কথা মনে রাখতে হবে, স্প্লিন্ট প্রতিদিন খুলতে হয়। গরম সেঁক দিতে হয় এবং অস্থিসন্ধি পূর্ণমাত্রায় নড়াচড়া করাতে হয়। অস্থিসন্ধি স্প্লিন্ট দিয়ে রাখাকালীন কিছু মাংসপেশির ব্যায়াম করাতে হয়। স্প্লিন্ট খোলার পর প্রতিরোধ ব্যায়াম শুরু করতে হয়।

ড্রাগ থেরাপি
তিন ধরনের ওষুধ নিয়মিত ব্যবহার করা হয় :

  • অ্যানালজেসিক বা ব্যথানাশক ওষুধ
  • অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি বা প্রদাহবিরোধী ওষুধ
  • ডিএমএ আরডি বা ডিজিজ-মডিফাইং অ্যান্টি রিউম্যাটিক ড্রাগস

এ ছাড়া স্টেরয়েড, বিশেষ করে অস্থিসন্ধিতে ইনজেকশনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ব্যথানাশক ওষুধের মধ্যে রয়েছে :

  • অ্যাসপিরিন
  • আইবুপ্রফেন
  • কিটোপ্রফেন
  • ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম
  • ন্যাপ্রোক্সেন
  • পাইরোক্সিকাম ইত্যাদি।

ডিএম এআরডি জাতীয় ওষুধগুলোর মধ্যে সাধারণত যেগুলো সচরাচর রোগীদের দেয়া হয় :

  • গোল্ড (সোডিয়াম অরোথিওম্যালেট) – ইনজেকশন আকারে ও মুখে। এটি বেশি দিন ব্যবহার না করাই ভালো।
  • পেনিসিলামাইন
  • সালফাস্যালাজিন
  • ক্লোরোকুইন
  • ড্যাপসন ও লিভামিসল

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় আদর্শ এনএসএ আইডি
এনএসএ আইডির পূর্ণ অর্থ হলো ননস্টেরয়েড অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি ড্রাগস। একই সাথে এরা ব্যথা এবং প্রদাহ কমায়। সত্যিকার অর্থে আদর্শ এনসএ আইডি বলতে কিছু নেই। তবে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় এনএসএ আইডির মধ্যে প্রথম পছন্দনীয় ওষুধটি হলো অ্যাসপিরিন। অবশ্য চিকিৎসকেরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী এনএসএ আইডি দিয়ে থাকেন। এনএসএ আইডির আদর্শমাত্রা হলো দিনে দু’বার। এক সময়ে একটি মাত্র এনএসএ আইডি ব্যবহার করা উচিত। দুই থেকে তিন সপ্তাহ চেষ্টা করা যেতে পারে। আর মনে রাখতে হবে, এনএসএ আইডি কেবল রোগের লক্ষণগুলোকে উপশম করে, রোগের প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব ফেলে না। সব এনএসএ আইডি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঘটায়, তাই এই ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শে সাবধানতার সাথে গ্রহণ করা উচিত।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমাটোলজি বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।
চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লি., ২ ইংলিশ রোড, ঢাকা। মোবাইল : ০১৬৮৬৭২২৫৭৭