নিয়ন্ত্রণহীন ফিজিওথেরাপি সেন্টারের কারনে শারীরিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষ

0
59
Print

জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্ট্রোক ও মেরুদণ্ডের সমস্যা বাড়ছে। ফলে চাহিদা বাড়ছে ফিজিওথেরাপির। এই সুযোগে বেসরকারি উদ্যোগে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে থেরাপি ক্লিনিক। যাচ্ছেতাই অবকাঠামো আর অদক্ষ জনবল নিয়ে পরিচালিত এসব ক্লিনিকে প্রতারিত হচ্ছে মানুষ।

রংপুর শহরের ক্যান্টনমেন্ট চেকপোস্ট, মেডিকেল মোড় এবং ধাপ চারতলা মসজিদের আশপাশে গড়ে উঠেছে এমন ফিজিওথেরাপি সেন্টার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিকাংশেরই নেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ডিপ্লোমাধারী অথবা স্বল্প শিক্ষিতরা দেন থেরাপি। অনেক ক্লিনিকে অনুমতি ছাড়াই বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের নাম ব্যবহার করার প্রমাণও পাওয়া গেছে।

একটি বেসরকারি ফিজিওথেরাপি ক্লিনিকে চিকিত্সা নিতে গিয়ে ক্ষতির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাহপুরের রবিউল ইসলাম (২১)। ২০১৫ সালে একটি স্বনামধন্য ক্লিনিকে ডিপ হিটিং মেশিন (শর্ট ওয়েভ) দিয়ে কোমরে থেরাপি দেয়ার সময় ভয়ানকরকম দগ্ধ হন তিনি। নীলফামারীর জেলার বাসিন্দা নজরুল ইসলামও অদক্ষ চিকিত্সকের খপ্পরে পড়েছিলেন বলে জানিয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রংপুর শহরজুড়ে এখন বিপুলসংখ্যক ফিজিওথেরাপি সেন্টার। ব্যবসা জমে যাওয়ায় এক মালিকের একাধিক ক্লিনিকও রয়েছে। তবে অধিকাংশ সেন্টার পরিচালনায় কোনো নিয়ম-কানুন মানা হচ্ছে না। এমনকি কিছু সেন্টারে অপ্রয়োজনে রোগী ভর্তি রেখে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব থেরাপি সেন্টারের মালিকদের কারো কারো ডিপ্লোমা কোর্সও করা নেই। রোগী আকৃষ্ট করতে অনেকে রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের নাম ব্যবহার করছে। বিশেষ করে ডিজিটাল ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার-১ ও ২, ফিজিও সেন্টার এবং স্পিচ ফিজিওথেরাপি সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তারা কোনো স্নাতক ফিজিওথেরাপিস্ট দ্বারা পরিচালিত নয়। টেকনিশিয়ান বা ননটেকনিশিয়ান অল্পশিক্ষিত লোকের মাধ্যমে দেয়া হচ্ছে সেবা। ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল টেকনোলজি অব ফিজিওথেরাপি কোর্সধারীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্টেট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি অব বাংলাদেশের সূত্রে জানা গেছে, মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের (ফিজিওথেরাপি) অবশ্যই বিভাগীয় প্রধানদের অধীনে কাজ করতে হবে। তাদের কাজ মেশিন অপারেট করা। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে না।

সম্প্রতি রংপুর ডিজিটাল ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার-১-এ গেলে মালিক ইয়াসিন আলী কাজল জানান, স্ট্রোকের রোগী ভর্তি হলে কেবিন ভাড়া চারশ’ টাকা এবং তিনশ’ টাকা করে দুটি থেরাপির জন্য ছয়শ’ টাকা নেন তারা। প্রতিদিন খরচ পড়বে মোট ১ হাজার টাকা। তার ডিপ্লোমা কোর্স আছে বলে দাবি করেন।

এই সেন্টারে রংপুরের বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের নাম সংবলিত সাইনবোর্ড টাঙানো রয়েছে। এই চিকিত্সকরা এখানে বসেন কিনা জানতে চাইলে ইয়াসিন আলী বলেন, তারা এখানে বসেন না, তবে রোগী চাইলে ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। সাইনবোর্ডে রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের প্রধান ব্রেইন, নার্ভ ও মেরুদণ্ড বিশেষজ্ঞ এবং নিউরো সার্জন ডা. মো. তোফায়েল হোসেন ভূঞার নামও রয়েছে। তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই ফিজিওথেরাপি সেন্টারের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। মালিককে তিনি চেনেনও না। অনুমতি না নিয়ে তার নাম ব্যবহার করায় ওই সেন্টারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন বলেও জানান।

ফিজিওথেরাপিস্ট ডা. মো. জুবায়েদ করিম জানান, থেরাপিস্টের অবশ্যই তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক জ্ঞান থাকতে হবে। রোগের ধরন ও তীব্রতা অনুযায়ী থেরাপিও আলাদা হয়। এতে ভুল হলে রোগী স্থায়ীভাবে প্যারালাইজড হয়ে যেতে পারে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ফিজিক্যাল থেরাপি অ্যাসোসিয়েশন, রংপুরের সভাপতি ডা. তাশিকুল ইসলাম বলেন, নিয়ম অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি সেন্টার পরিচালিত হবে স্নাতক ফিজিওথেরাপিস্টদের দ্বারা। আর ডিপ্লোমাধারীরা তাদের অধীনে কাজ করবেন। কিন্তু এখনো তা মানা হচ্ছে না। ফিজিওথেরাপিস্টদের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা না থাকার কারণেই এমনটি ঘটছে বলে মনে করেন তিনি।

তবে দীর্ঘদিন ধরে এসব বেসরকারি ক্লিনিক তত্পর থাকলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা সিভিল সার্জন ডা. আবু মো. জাকিরুল ইসলাম।