পরিবর্তন চাই স্বাস্থ্যখাতে

0
57

প্রদীপ চন্দ্র দাসঃ-
পরিবর্তন চাই স্বাস্থখাতে,আরো উন্নতি প্রয়োজন সামগ্রিক হেলথ সেক্টরের, এমন কথাগুলা বলছিলেন ভিশন ফিজিওথেরাপি এন্ড নিউরো রিহ্যাব সেণ্টারের কর্নধার ডাঃ সাইফুল ইসলাম পিটি । এ সম্বন্ধে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি বলেন
অনেকদিন আগের একটা ঘটনা দিয়ে শুরু করে বলেন , বাসে করে মহাখালী থেকে উত্তরা আসতে ছিলাম। পাশের সিটে আমার বাবার বয়সি (৬০) এক চাচা বসে আছেন । চাচা দেখি ফোনে কথা বলতে বলতে আস্তে আস্তে কাঁদতেছে। আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে,,, চাচার কাঁধে হাত রেখে বললাম, চাচা কি সমস্যা। চাচা কিছু বলল না। অনেকক্ষন পর আস্তে আস্তে জানতে পারলাম, রংপুর থেকে ঢাকা আসছে চিকিৎসার জন্য বক্ষব্যাধি হাসপাতালে। দুদিন যাবত ঘুরে ডাক্তার দেখাতে পারলেও, এক্সরে করাতে পারে নাই এখনও। ঢাকা শহরে থাকার জায়গা নেই তাই গাজিপুর যাচ্ছে এলাকার পরিচিত কারও কাছে রাত থাকতে। চাচাকে আমি আমার পরিচয় দিলাম। আমি একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক। বাত ব্যথা প্যারালাইসিসের চিকিৎসা করি। চাচা এবার আমার হাত ধরে কেদে দিল, বলল, বাবা মন চায় ঘরের মধ্যে মরে যাই, তবুও হাসপাতাল আসতে ভাল লাগে না। চিকিৎসা নিতে এত কষ্ট! চাচা ফুসফুসের সমস্যায় ভুগতেছিল অনেক দিন। চাচার তখনও বুক আর পীঠ ব্যাথা করছিল। আর চোখের পানি পড়তেছিল। আমারও ভিতরটা কাঁদতে লাগল। আমি বললাম চাচা আপনি আমার সাথে চলেন, কাল সকালে বক্ষব্যাধি হাসপাতালে যাবেন। চাচা রাজি হয় নাই। উনি কাল এসে আবার এক্সরে করবেন, না হলে অসুখ নিয়েই বাড়ি ফিরবেন। তখন প্রায় সন্ধ্যা। আমি উত্তরা রাজলক্ষ্মীতে নেমে পড়লাম। বুকে একটা ব্যথা আমারও শুরু হল। রাতটাও খারাপ গেল,,,,,, মনে মনে অনেক প্রশ্ন আসল। ওই লোকটা যদি আমার বাবা হত!!! এই ধরনের ঘটনা অসংখ্য আছে।একটা দিয়েই বুঝা যায়,, আমাদের দেশের চিকিৎসার কি অবস্থা!!!!
সরকারি হাসপাতালে এত হয়রানি হলে গরীব আর মধ্যবিত্ত মানুষ যাবে কোথায়।
আসলে কারা দায়ী এই অদ্ভুত স্বাস্থ্যসেবার পিছনে। তবে কি সেই পুরনো বাজে সিস্টেম, ঈর্ষা, দুর্নীতি, আর এক চোখানীতিই আমাদের কে ডুবালো অতলে । স্বাস্থ্যখাতের একটা পরিবর্তন নিয়ে এখনই আমাদের সোচ্ছার হওয়া উচিত, সবার জন্য বেষম্যমুক্ত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের জন্য আমাদের এখনই কিছু বিষয়ে কাজ করতে হবে। এই ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সবার আগে উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদেরও বাবা মা আছে, আমরা নিজেরাও রোগী হব। আমি ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক হিসেবে অনেক বড় বড় চিকিৎসক এবং চিকিৎসকের বাবা মা স্ত্রী ভাই বোন সন্তানসন্ততিকে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা দিয়েছি। অনেকেই অনেকভাবেই চিকিৎসা হয়রানির শিকার । আমরাই নিজেরাই যদি হয়রানি হই,,, সাধারন মানুষ যাবে কোথায়?? এখনি আমাদের চিকিৎসা সেবা নিয়ে ভাবা উচিত। কিছু পরিবর্তন হতেই হবে । তিনি কিছু উদাহরন স্বরুপ বলেন যেমন :

১। পৃথিবীর সবচেয়ে বৈষম্যযুক্ত এবং বাজে সিস্টেম হল,, Out- of-pocket payment system , আপনার চিকিৎসা আপনি নিজ খরচেই করতে হবে অর্থাৎ আপনার পকেটে টাকা থাকলেই চিকিৎসা, আর না থাকলে নাই । যার পকেটে যত টাকা আছে তার চিকিৎসা তত ভাল। যার পকেটে টাকা নাই, তার চিকিৎসাও নাই।
অথচ WHO বলতেছে সবার জন্য চিকিৎসা। আসলেই কি সবার জন্য চিকিৎসা??? ধরুন, একজন রিকশা চালকের হার্ট অ্যার্টাক হল, ডাক্তার দেখে বলল আপনার বাইপাস করাতে হবে, দুই লাখ টাকা লাগবে। এখন বলুন তার কি আদো চিকিৎসা হবে? হলে কিভাবে?
ধরুন,,, একজন কোমর ব্যথার (PLID) রোগী তাকে ২ সপ্তাহ নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নিতে হবে, প্রতি সেশন ৪০০/৫০০ টাকা। কিংবা একজন স্ট্রোক রোগীকে ৩/৪ মাস টানা ফিজিওথেরাপি নিতে হয়। একজন কোয়ালিফাইড ফিজিওথেরাপি চিকিৎসককে প্রতি সেশন ৫০০ টাকা দিতে হবে। এর চেয়ে কম দিলে সেই নিজেই চলতে পারবে না। কারন একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক দিনে ৮/১০ টার বেশি রোগী দেখতে পারবে না। আমার নিজের বাবা মা স্ট্রোক করলে এত টাকা খরচ করে চিকিৎসা দিতে পারব কিনা সন্দেহ আছে। আমার মত অসংখ্য চিকিৎসক আছে।
এখন আপনিই বলেন! WHO এর স্লোগান,, সবার জন্য চিকিৎসা!!! আসলেই কি তাই!! বাস্তবতা হল,,, গরীবের বড় কোন অসুখ হলে চিকিৎসার জন্য ঘর বাড়ি বিক্রি করে পথে বসা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না।
অথচ সরকার চাইলেই এই সমস্যা দূর করতে পারে! শুধু দরকার ইচ্ছা এবং সঠিক কর্ম পরিকল্পনা এবং কঠোর প্ররিশ্রম। সরকারি বেসরকারি – চাকুরিজীবি এবং সাধারন মানুষ সবার কাছ থেকে আয় অনুযায়ী কম বেশি একটা হেলথ ট্যাক্স নিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। ২০১৫-১৬ সেশনে সরকারের মোট হেলথ বাজেট হল ১২ হাজার কোটি টাকা ( ১২৬৯৫)। ১৬ কোটি মানুষের কাছ থেকে মাসে গড়ে ১০০ টাকা করে নিলে বছর শেষে আমাদের বাজেটে দেড়্গুন টাকা যোগ হয়। মোট ৩০ হাজার কোট টাকার বেশি হয়।
এই টাকা দিয়ে দেশের সব মানুষকে সঠিক চিকিৎসা দিয়ে প্রতি বছর বেশ কিছু সরকারি মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল, ইনস্টিটিউট তৈরি করা সম্ভব। । শুধু দরকার সঠিক পরিকল্পনা। দেশে প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা আসলেই কম। আর একটা কথা, চিকিৎসককে টাকা দিবে সরকার!!! পাবলিকের হাত থেকে টাকা নিলেই যত সমস্যা।বেশি ইনকামের জন্য কেউ কেউ অসৎ পথেও পা বাড়ায় “!! বাহিরের দেশে চিকিৎসকের আয় আমাদের দেশের চিকিৎসকের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। কিন্তু সেখানে টাকা দেয় সরকার, তাই চিকিৎসকদের আয় নিয়ে জনগনের মাথা নেই। চিকিৎসককেও জীবিকা অর্জনের জন্য চিন্তা করতে হয় না। ভাল চিকিৎসা এমনিতেই নিশ্চিত হয়।

২। হেলথে আরেকটা বাজে ব্যাপার হল, প্রফেশনালদের নিজেদের মধ্যে অর্ন্তকোন্দল, ঈর্ষা আর নিজেদেরকে বেশি বড় ভাবা। যেমন :
ফিজিওথেরাপির মত অত্যাধুনিক এই চিকিৎসা ব্যবস্থাকে শুধু ঈর্ষার বশিভূত হয়ে হেয়ও করে রাখা হয়েছে। অথচ এই চিকিৎসাকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে উন্নত করা হলে অর্থোপেডিক, নিউরো, আর্থাইটিস এই সব ক্ষেত্রে মানুষের জন্য যুগান্তরকারি সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হত। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশেই অর্থোপেডিক, নিউরোলজিস্ট, ফিজিক্যাল মেডিসিন এবং ফিজিওথেরাপিস্ট যৌথ ভাবে কাজ করে আসছে। এছাড়া অকুপেশনাল থেরাপি এবং স্পীচ থেরাপি আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে।বিশেষ রিহ্যাবিলিটেশন সেক্টরে।
মেডিকেল টেকনোলজিস্টরাও রোগ নির্নয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নার্সিং পেশারও দিন দিন উন্নতি হচ্ছে। আমি চাই,, সারা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে তারা আরও বেশি এগিয়ে যাক। হেলথে উন্নতি চাইলে সবাইকে নিয়েই এবং সঠিকভাবে মর্যাদা দিয়ে এগোতে হবে। তাহলে সুচিকিৎসা নিশ্চিত হবে। ইনশাল্লাহ।

৩। আমাদের দেশে অনেক অনেক ভাল ভাল চিকিৎসক আছেন, যারা অনবরত মানুষের সুচিকিৎসার জন্য সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কাজ করে যাচ্ছে। অথচ ওই সব মহত মানুষদের নিয়ে প্রচার মাধ্যমে ভাল কোন রির্পোট হয় না বা তারা ভাল কাজের জন্য খুব কমই পুরষ্কৃত হয় । তারা আড়ালেই থেকে যায়। তাই নতুনরাও ভাল কাজের জন্য উৎসাহ পায় না। উৎসাহ দেওয়া দূরে থাক! প্রচার মাধ্যমগুলো ডাক্তার নিয়ে শুধু সমালোচনায় মেতে থাকে। এটা খুব জঘন্য।
আমি মনে করি,,, এই দেশের out-of-pocket payment সিস্টেমের কারনে ডাঃ দের কসাই বলে গালি শুনতে হচ্ছে। অথচ বাহিরের দেশের চিকিৎসকের ইনকাম আমাদের দেশের চেয়ে অনেক অনেক বেশি । কিন্তু ওই সব দেশে Out-of-pocket payment সিস্টেম না থাকার চিকিৎসক আর রোগী সবাই খুশি।
সবশেষে বলব, যা দিনকাল আসতেছে, যেভাবে রোগ শোক বাড়তেছে, আপনি যদি মধ্যবিত্ত হোন তাহলে আপনার কপালে শনি আছে, আপনি চিকিৎসক হোন আর আম জনতা হোন!!! তাই এখন থেকেই শারিরীক প্ররিশ্রম বেশি বেশি শুরু করেন। তাহলে অন্তত ৫০% রোগ ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকবেন। এবং কিছুটা হলেও শান্তিতে শেষ জীবন কাটাতে পারবেন।
তিনি আশাব্যাক্ত করে বলেন সরকার চিকিৎসা সেবা ও মান বৃদ্ধিতে যোগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহন দেশ ও জাতির কল্যানে অগ্রণী ভুমিকা রাখবে।
উল্লেখ্য যে তিনি উনার ভিশন ফিজিওথেরাপি সেন্টারে গরিব,দুঃস্থ রোগীদের স্বল্প খরচে ফিজিওথেরাপি সেবা প্রদানের ঘোষনা দেন।