ফিজিওথেরাপি অনেক কাজে লাগে : ডা. এস চক্রবর্তী



  • Add Comments
  • Print
  • Add to Favorites

দেশ-বিদেশের মানুষের অপারেশন ছাড়াই হাঁটু, কোমর, ঘাড়, মেরুদণ্ড ব্যথা ও প্যারালাইসিস রোগিকে ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে স্পেশালাইজড ফিজিওথেরাপি ও আর্থ্রাইটিস রিসার্চ সেন্টার লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন ডা. এস চক্রবর্তী (পিটি)।

রাজধানীর শ্যামলী রিং রোডস্থ রিং টাওয়ারে অবস্থিত এই সেন্টারে বাত-ব্যথা-প্যারালাইসিস ও ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ ডা. এস চক্রবর্তী বুধবার ফিজিওথেরাপির চিকিৎসা পদ্ধতির নানা দিক নিয়ে কথা বলেন বাবার্তা২৪ডটনেটের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি বিবার্তার পাঠকদের জন্য তুলে ধরছেন উজ্জ্বল এ গমেজ।

গমেজ : মিডিয়ার কারণে ‘ফিজিওথেরাপি’ কথাটি আজকাল অনেক পরিচিত। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ এর সঙ্গে প্র্যাকটিক্যালি পরিচিত নয়। তারা জানে না, বিষয়টি আসলে কি এবং এটা থেকে তারা কিভাবে উপকার পেতে পারে। আমাদের পাঠকদের জন্য একটু ব্যাখ্যা করবেন?

ডা. এস চক্রবর্তী : ফিজিওথেরাপি বিষয়টা ইতোমধ্যেই আমাদের দেশে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে। তবে বেশিরভাগ মানুষই জানে না ফিজিওথেরাপিটা কখন সবচেয়ে জরুরি। যেমন, বিবার্তার সম্পাদকের কথাই বলা যায়। আপার পাটা মচকে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক এটাকে কয়েক মাস প্লাস্টার করে রেখেছেন। সাথে সাথেই কিন্তু একজন ফিজিওথেরাপি স্পেশালাইজডের কাছে চিকিৎসা শুরু করা দরকার ছিল। কিন্তু তা না করে আপা আস্তে আস্তে স্ক্যাচে ভর দিয়ে হাঁটতে থাকেন। এমনি এমনিতেই সব ঠিক হয়ে যাবে এই আশা নিয়েই আপা হাঁটা শুরু করলেন। আসলে ঠিক হচ্ছে না। আস্তে আস্তে তিনি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এই কাজটা যদি না করে একজন ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞর কাছে যেতেন তাহলে আরো দুই মাস আগেই সুস্থ হয়ে যেতেন। এই কয়েকটা মাস উনাকে এতো কষ্ট ভোগ করতে হতো না। শুধু ভুল তথ্যের জন্য এমনটা করতে হয়েছে। যিনি চিকিৎসা করেছেন তিনি পাটা মচকে যাওয়ার পর সুন্দর করে প্লাস্টার করেছেন। ‍যত দিন রাখার দরকার তা রেখেছেন। চিকিৎসা ভাল হয়েছে। কিন্তু আপা পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। এজন্য দরকার ছিল থেরাপি চিকিৎসার পুনর্বাসন।

ধরা যাক, একজন রোগি দুর্ঘটনায় পা ভাঙল, কোমর ভাঙল বা ব্যথা পেল, মচকে গেল বা প্যারালাইসিস হল, যেটাই হোক, রোগিকে পুনর্বাসন করতে হবে। আমাদের ধারণা শুধু রোগির প্যারালাইসিস হলেই পুনর্বাসন দরকার হয়। কিন্তু আসলে একজন রোগি আঘাত পেয়ে হাঁটু না ভাঙলেও তাকে পুনর্বাসন করতে হবে। অর্থাৎ তিনি যে কাজ করতেন সে কাজ করার মতো করে তার ফিটনেসে পুনরায় ফিরিয়ে নিতে হবে।

এক্ষেত্রে এভাবে বলা যায়, একজন গাড়ির ড্রাইবার দুর্ঘটনায় যদি তার একটা হাঁটু ভাঙে, প্লাস্টার করার পর হাঁটুটা সোজা হল। কিন্তু চিকিৎসার পর হাঁটু যদি ভাঁজই না করতে পারেন তাহলে উনি তো আর গাড়ি চালাতে পারবেন না। এই সোজা হাঁটুকে ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বা ফিটনেসের জন্যই থেরাপি চিকিৎসা নিতে হবে। ‍যদি আমরা প্লাস্টার খোলার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ফিজিওথেরাপি দেই তাহলে ওই চিকিৎসাটা খুব দ্রুত কাজ করবে। আর না দিলে আস্তে আস্তে ওই অঙ্গটা অবশ হয়ে যেতে পারে। আর স্ট্রোকের প্রথম দিন থেকেই ফিজিওথেরাপি শুরু করা উচিত।

স্ট্রোক থেকে প্যারালাইসিস হলে তাকে সাথে সাথেই ফিজিওথেরাপি দিতে হবে। তাহলে রোগি আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে যাবে।

 

গমেজ : একজন সুস্থ মানুষ শরীরে কি কি ধরনের লক্ষণ অনুভব করলে আপনি তাকে ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নিতে বলবেন?

ডা. এস চক্রবর্তী : আপনি একজন সাংবাদিক, আপনাকে প্রচুর হাঁটাচলা করতে হয়। দেখা গেল আপনি চার ঘণ্টার একটা অ্যাসাইনমেন্টে গেছেন সেটা দুই ঘণ্টা করার পর কোমর ব্যথা শুরু হয়েছে, পা ব্যথা করছে। এটা অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই আছে। এর মানে আপনি আনফিট। আপনি এই দুই ঘণ্টা কাজ করার জন্য ফিট নন। কিন্তু আপনাকে কাজ করতে হবে ১০ ঘণ্টা। তাহলে আপনার মধ্যে ফিটনেস আনতে হবে। এটা শুধু সাংবাদিকতার জন্য না, অফিস-আদালত, ক্রিকেট-ফুটবল খেলোয়াড়সহ যে কোনো মানুষের ক্ষেত্রেই হতে পারে। প্রথমে আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিষয়টা বুঝতে হবে। তারপরে একজন ফিজিওথেরাপি বিশেজ্ঞর কাছে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হবে।

গমেজ : হাড় ক্ষয় একটি নীরব ঘাতক। এ রোগ কাদের হয় এবং রোগের লক্ষণ কি?

ডা. এস চক্রবর্তী : হাড় ক্ষয় বলতে আমরা অনেকেই ভুল বুঝি, ক্ষয় মানে জিনিসটা ছোট হয়ে যাওয়া, আসলে কি তাই? হাড় ক্ষয়টাকে বলা হয় ‘অস্টিওপোরোসিস’। এটাকে ক্ষয় রোগ বলা যায়। হাড়টা ছোট হয়ে যাচ্ছে না, এটা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। যেমন দেড় শ’ বছরের একটা বিল্ডিংয়ে কেউ কি থাকতে পারবে? হয়তো পারবে, তবে মনে ভয় কাজ করবে, যে কোনো মুহূর্তে বিল্ডিংটা ভেঙে পড়ে যেতে পারে। মানুষের বেলায়ও ঠিক তাই। কিন্তু রানা প্লাজার মতো যদি সেটা ১২ বছরের পুরোনো বিল্ডিং হয়, সেটা আবার অস্বাভাবিক। দেড় শ’ বছরের একটা বিল্ডিংটা ভাঙতেই পারে। কারণ ওটার মেয়াদ শেষ। ওটাকে ভেঙে নতুন করে গড়ে তুলবো, এটাই হচ্ছে আমাদের টার্গেট। একইভাবে ১০০ বছরের একজন মানুষ, তাঁর হাড় দুর্বল হতে পারে, এটা আমরা মেনে নিতে পারি। কিন্তু ৪০ বছরের একজন মানুষের ‘অস্টিওপোরোসিস’ শুরু হয়েছে, এটা একটু চিন্তার বিষয়। এই রোগিদের সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে যে হাড়টা ক্ষয় হয়ে ভেঙে যায়, সেটা আর জোড়া নেয় না। ৪০ বছরের একজনের এই রোগে পা ভেঙে গেলে ওই রোগিকে সারা জীবন পঙ্গু হয়েই থাকতে হবে। এই যে রোগিকে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হলো, এর জন্যই হাড় ক্ষয়কে বলা হয় নীরব ঘাতক।

গমেজ : এর প্রতিকার কী?

ডা. এস চক্রবর্তী : অনেকেই মনে করেন খাবারের কারণে হাড় ক্ষয় হয়। এটা ভুল ধারণা। ভালো খাবার খেলেই যে হাড় ক্ষয় হবে না, তা না। এখানে একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। একটা দেশি মুরগি ও ফার্মের মুরগি। ফার্মের মুরগি কিন্তু প্রচুর পরিমাণে খায়। খাবারে নিউট্রেশনের কোনো ঘাটতি নাই। ওকে ক্যালসিয়াম, মিনারেল, ভিটামিন, আইরন সবই খাওয়ানো হচ্ছে। কিন্তু দেশি মুরগিকে কি কেউ এভাবে খাওয়ায়? নিশ্চয় না। তাহলে কোন মুরগির হাড় বেশি শক্ত? নিঃসন্দেহে দেশি মুরগির। কেন? পার্থক্যটা কি? খাবারের দিক থেকে আমি মনে করি, বেশি নেগেটিভ খাবার খাচ্ছে দেশি মুরগি। আর পজেটিভ খাচ্ছে ফার্মের মুরগি। তবুও কেন ফার্মের মুরগির হাড় শক্ত না? কারণ একটাই। দেশি মুরগি বেশি এক্সারসাইজ করে। অন্যদিকে ফার্মের মুরগি কোনো এক্সারসাইজ করে না। এই একটি কারণেই এক জাতের মুরগির হাড় শক্ত এবং অন্য জাতের মুরগির হাড় নরম হচ্ছে।

একই কথা আমাদের মানুষের বেলায়ও প্রযোজ্য। অনেকেই বলেন, আমি তো প্রত্যেক দিন একটা করে ক্যালসিয়াম টেবলেট খাচ্ছি, উন্নত মানের খাবার খাচ্ছি, কিন্তু এরপরেও কেন হাড়ে ক্ষয় রোগ হল? এর উত্তর হলো আপনি যা খাচ্ছেন এক্সারসাইজ না করলে তার ঠিকমতো মেটাবলিজম হয় না। খাবারটা হাড়ের মধ্যে ঠিকমতো ঢোকে না। খাবারকে হাড়ে মধ্যে ঢুকতে হলে আপনাকে প্রচুর পরিমাণে খাবারকে এক্সারসাইজ দিতে হবে। আপনি খাবেন আর বসে বসে ঘুমাবেন, কাজ করবেন না, তাহলে কী আপনার শরীরের হাড় শক্ত হবে? এই কারণে মানুষের ‘অস্টিওপোরোসিস’ রোগ বেশি হচ্ছে।

এই রোগ থেকে রক্ষা পেতে ব্যায়ামের বিকল্প নাই। গ্রামের যারা দিনমজুর কিংবা শহরের রিক্সাওয়ালাদের হাড় ক্ষয় রোগ কম হয়। তাদের হাড় প্রচণ্ড শক্ত। তারা একজন ধনী লোকের চেয়েও অনেক কম খান। একজন ধনী যা খাচ্ছেন তার চেয়ে অনেক নিম্ন মানের খাবার খাচ্ছেন তারা। কিন্তু হাড় শক্ত হওয়ার একটাই কারণ, তাদের প্রচুর এক্সারসাইজ হচ্ছে। ফলে যা খান তাই তার কাজে লাগে। আর ধনীরা যা খান দেখা যায় মাংস বেড়ে যাচ্ছে। সাইড দিয়ে মাংস, চর্বি বাড়ছে কিন্তু হাড়ে কিছু ঢোকেনি। এর জন্যই ধনীদের এতো ভালো খাবার খাওয়ার পরও হাড় ক্ষয় রোগ বেশি হয়।

গমেজ : কখনও কখনও রোগি বাসায় থেকে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নিতে আগ্রহ দেখান। এটা কি ঠিক ?

ডা. এস চক্রবর্তী : অবশ্যই একজন রোগি বাসায় থেকেও ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নিতে পারেন। কিন্তু সেটা নির্ভর করে রোগির অবস্থার উপর। ফিজিওথেরাপি একটি সূক্ষ্ম চিকিৎসা পদ্ধতি। অনেক ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতির প্রয়োজন। এ জন্য সেন্টারে নিতে পারলে সবচেয়ে ভালো। তবে যে চিকিৎসায় যন্ত্রপাতি প্রয়োজন নেই সেখানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা সাজেস্ট করি যে, এই রোগি বাসায় থেকেও চিকিৎসা নিতে পারবেন।

গমেজ : আর্থ্রারাইটিস কেন, কখন এবং কাদের হয়। ফিজিওথেরাপি কি এর একমাত্র চিকিৎসা?

ডা. এস চক্রবর্তী : এটি বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে জন্মগত, বংশানুক্রমে রক্তের কারণে হয়ে থাকে। আরেকটা ট্রমাটিক আর্থ্রারাইটিস। অনেকের দেখা যায় যে ওজন বেশি। ওজনের কারণে ট্রমাটিক আর্থ্রারাইটিস হয়ে যায়। যেমন একজনের পায়ের চেয়ে শরীরের ওজন বেশি। পায়ের শক্তি কম এই অবস্থায় হাঁটাচলা করছে, হাঁটুর উপর লোড পড়ছে। যেমন, রানা প্লাজা পাঁচতলা ফাউন্ডেশন নয়তলা বিল্ডিং। ফলে ভেঙেচুরে গেল। ক্ষয় রোগ আর্থ্রারাইটিস হলো আমাদের শরীরের প্রতিটি জয়েন্টে একটা করে কুড়কুড়ে মাংস থাকে। এটাকে বলা হয় কার্টিলেস। এর ডিজেনারেশন বা দুর্বল হয়ে যাওয়াকে আমরা আর্থ্রারাইটিস বলি। এটা দুর্বল ঘুণেধরা বাঁশের মতো। শরীরের ওজন সেটাকে আঘাত করলে ভেঙে যায়। এর জন্য আর্থ্রারাইটিস রোগিদের কারো হাত, কারো পা বাঁকা কিংবা অবশ হয়ে যায়।

এই রোগিদের ফিজিওথেরাপি কেন দেয়া হয়, কারণ এটা মাসলকে শক্তিশালী করে, যেন লোডটা না পড়ে, লোডটাকে প্রতিরোধ করতে পারে। এ জন্য এই রোগির ওজন কম রাখতে হবে। তাহলেই কার্টিলেজটা ভাঙবে না। এ রোগে অন্য কিছু মেডিসিনও কাজ করে। তবে ফিজিওথেরাপি অবশ্যই নিতে হবে। যেমন ডায়বেটিস। এটাকে শুধু মেডিসিন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে তো আর ব্যায়াম করার কথা বলা হতো না। আর্থ্রারাইটিস রোগিদের জন্য প্রথম চিকিৎসা এক্সারসাইজ, দ্বিতীয় চিকিৎসা খাবার আর তৃতীয় চিকিৎসা হলো প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু মেডিসিন।




No Comments to “ফিজিওথেরাপি অনেক কাজে লাগে : ডা. এস চক্রবর্তী”

Comments are closed.