ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের কাছে খোলা চিঠি



  • Add Comments
  • Print
  • Add to Favorites

প্রিয় সুহৃদ, শুভেচ্ছা নিন। 
সম্ভবত আমরাই পৃথিবীর একমাত্র পেশাজীবী যাদের জন্ম থেকেই সংগ্রাম করতে হয় শিক্ষার জন্য, শিক্ষালয়ের জন্য, মানুষকে সঠিক চিকিৎসা সেবা দেবার জন্য, মাথা উঁচু করে কাজ করার জন্য রক্ত দিয়েছি- রাজপথে পুলিশের মার খেয়েছি, জেল-জুলুম খেটেছি, হাসপাতাল চত্বরে লাঞ্ছিত হয়েছি, রক্ত দিয়েছি, অহরহ অপমানিত হচ্ছি।

কিন্তু আমরা কখনো থেমে থাকিনি, স্বীয় প্রচেষ্টায় আমরা ক্রমান্নয়ে আমাদের যোগ্য করেছি, মাথার ঘাম পা ফেলে স্ট্রোক, জিবিএস রোগিকে দাড় করিয়েছি, শুয়ে থাকা রোগী কে পায়ে হেঁটে বাড়ি পাঠাচ্ছি। কিন্তু লাভ কি, আইন শৃংখলা বাহিনীর কাছে আমরা ভুয়া চিকিৎসক।আমাদের ছেলে মেয়েরা বেকার। স্বাধীনভাবে কাজ করতে হাজার সমস্যা। দেশে যেখানে ৩০ হাজার ফিজিও দরকার, সেখানে আমরা শুধু ২ হাজার ফিজিও কেই সঠিকভাবে কর্মসংস্থান দিতে পারছি না। আমাদের দমিয়ে রাখার সব চেষ্টা একটা মহল করে আসছে শুরু থেকেই।

আমদের কোর্স বন্ধ করে দেয়া হল, দেশ স্বাধীন হল- আমরা পরাধীন হলাম। আমাদের সরকারি পোস্ট এ ডাক্তার গন বসলেন, যন্ত্র দিয়ে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা কায়েম করলেন, আমাদের যন্ত্রবিদ করার চেষ্টা করা হল। অত্যান্ত দু:খের বিষয় গ্রাজুয়েট ফিজিওদের জন্য একটা সরকারি চাকুরী নাই। আমরা যাব কোথায়। আমাদেরকে প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করার জন্য ওরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উপরও আঘাত করল, আমাদের কলেজ বাস্তবায়ন অন্ধকারে ফেলে দেয়া হল, আমাদের সারাজীবনের জন্য টেকনিশিয়ান হিসেবে রাখার বিশাল ষড়যন্ত্র হিসেবে ব্যাচেলর অব ফিজিওথেরাপি ভেংগে বি এসসি ইন ফিজিওথেরাপি করা হল।আমরা আন্দোলন করলাম, আমাদের ছয় নয় বুঝিয়ে দিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জুজুর ভয় দেখিয়ে আমাদের হাত পা বেধে ঘরে রেখি দিল। আমরা হেরে গেলাম শোচনীয় ভাবে। ওরা আমাদের কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজ বন্ধ রেখে ফিজিওথেরাপি শিক্ষাকে তিল তিল করে শেষ করে দিতে লাগল। কিছু কিছু ব্যবসায়িক লোক দিয়ে ফিজিওথেরাপি কোর্স চালু করল। ফিজিক্যাল মেডিসিনের ডাক্তাররা হল ওখানকার শিক্ষক।কি হাস্যকর! ওদের না আছে হাসপাতালের ব্যবস্থা, না আছে ভাল শিক্ষক, উনারা কিভাবে আমাদের শিখাবে। মুখস্থ কিছু বিদ্যা শিখিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দিচ্ছে।আর আমরা কর্মহীন আর হতাশ হয়ে ঘুরতেছি। না শিখলে কিভাবে আমরা মানুষকে ভাল চিকিৎসা দেব, মানুষের আস্থা অর্জন করব! ফিজিওথেরাপি নামে ব্যবসা শুরু হল করছে কিছু লোক, অকুপেশনাল ফিজিওথেরাপি ডাক্তার গনের চেম্বারে যন্ত্র থেরাপি, টেলিভিশন থেরাপি, ডিব্বা থেরাপি চালু হল। আমাদের বিরুদ্ধে ডাক্তার সমাজ, পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট একশন নেয়ার সুযোগ পেল। মানুষ কিছু কিছু লোকের নাম নিয়ে ফিজিওথেরাপিস্ট দের গালিগালাজ দিতে থাকল, আমরা কি হেরে গেলাম? না আমরা শুধু হারি নি- আমাদের অস্তিত্তে কুঠার আঘাত আমরাই করলাম।

আমাদের যা করার এখনি করতে হবে । ইউনাইটেড বিপিএ এর মাধ্যমে সারা দেশ ব্যাপী ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা সম্পর্কে জানাতে হবে, আমাদের কাজ কি, গণ্ডি কি ঠিক করতে হবে। ফিজিওথেরাপি বেবশা করা ডাক্তার, খোদ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক, অন্যান্য আগাছা থেরাপি দের বিরুদ্ধে সেচ্ছার করতে হবে- বিপিএ কে নির্দিষ্ট করে দিতে হবে কে কতটুকু করবে,কার গণ্ডি কত, এর বিরুদ্ধে যারা যাবে তাঁদের বহিস্কার করতে হবে। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা সমাধান করতে, আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। সময়মত পরীক্ষা, ভাল শিক্ষক, নিয়মিত ক্লাস এইগুলো নিশ্চিত করার জন্য ছাত্র-ছাত্রীদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সঠিক ভাবে ইন্টার্ন সম্পন্ন করতে হবে। এর জন্য আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব নিতে হবে, তারা না পারলে ফিজিওথেরাপি কোর্স বন্ধ করে দিক। ছেলে মেয়েদের জীবন নিয়ে খেলার অধিকার কারও নাই।ছাত্র-ছাত্রীদের সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ তাদের কাছ থেকেই আসতে হবে । প্রফেশনালদের সমস্যা প্রফেশনালদের করতে হবে। সকল ফিজিওথেরাপি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের অচিরেই একটা সম্মেলন করা দরকার। আজকে যেসব ফিজিও বেকার কিংবা নামেমাত্র কাজ করতেছে জীবন বাচানোর জন্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের জন্য কি করতেছে? কিছুই না। ভবিষ্যতেও করবে। এসব কাজ কারা করবে? আমরা হয়তো ভাবি, আমাদের সংগঠন আছে, নেতা আছে, সিনিয়র আছে, উনারা করবে। কিন্তু না, এই কাজ আমাদের প্রত্যেককে স্বদ্যোগে করতে হবে। নতুবা পাশ করে জুতা ক্ষয় করলেও ভাল একটা চাকুরী হবে না। দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের নিজেদেরই কিছু করতে হবে। আমরা একটা নিউরো রোগীকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চিকিৎসা করি অল্প কিছু সম্মানিতে, কখনো বিনা সম্মানিতেও দেখতে হয়। টাকা পয়সা যাই হোক সম্মানই যদি না থাকে আপনি এই পেশায় থাকবেন কেন?

আসুন আমরা অন্তত প্রতি বছর একবার ফিজিওথেরাপি শিক্ষার্থী সম্মেলন করি, আমরা শিক্ষার্থীদের কথা শুনি, তাঁদের সমস্যার কথা শুনি, প্রফেশনাল আর শিক্ষার্থীদের বন্ধন দৃঢ় করি, একদিন তো তারাই প্রফেশনাল হবে। ঐ সম্মেলনের মাধ্যমে তাঁদের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলি, তাঁদের সমস্যা সমাধানে আগিয়ে আসি, নতুন নেতৃত্ব তৈরি করি, নতুন কর্মী তৈরি করি।

আপনি মেধাবী আপনি প্ররিশ্রমি। আসুন আমরা কিছু করি, নিজেদের জন্য করি। কিছু একটা করি যাতে মাথা উঁচু করে দাড়াতে পারি, বুক উঁচু করে দৃঢ় চিত্তে বলতে পারি- আমি ডাঃ অমুক, আমি একজন চিকিৎসক- ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক, আমি রোগীকে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা দেই, আর এটা আমার অধিকার।
সৃষ্টিকর্তা আমাদের সহায় হউন।

ডাঃ সাইফুল ইসলাম, পিটি
ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক, ভিশন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক,

ডাঃ কাজী এমরান হোসেন, পিটি
ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক,স্যার উইলিয়াম ফাউন্দেশন

[মতামত বিভাগের লেখা  সম্পূর্ণভাবেই লেখকের নিজেস্য মন্তব্য । ]

Tags:

No Comments to “ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের কাছে খোলা চিঠি”

Comments are closed.