ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা অত্যাধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি স্বাধীন চিকিৎসা ব্যবস্থা



  • Add Comments
  • Print
  • Add to Favorites

ডাঃ সিমসন কল্যাণ বাড়ৈ ( বীর মুক্তিযোদ্ধা )

‘ফিজিওথেরাপি’ সম্পর্কে বাংলাদেশের সম্মানিত জনগণ, সরকার ও ইহার অন্তর্গত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিবর্গ এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের সহিত যাহারা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত তাহাদের উদ্দেশ্যেই আমার এই অতি সংক্ষেপিত ব্যাখ্যা প্রদান করিতে স্বচেষ্ট হইলাম। তিনি যে কেহই হউন না কেন যেন ইহাদ্বারা সামান্যতমও উপকৃত হইতে পারেন।

“সৃষ্টিকর্তা এই পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছেন একটি উদ্দেশ্য সাধন করিবার জন্য। প্রত্যেক মানুষকে তালন্ত বা দান সঙ্গে করিয়া পৃথিবীতে পাঠাইয়াছেন। তাঁহার দেওয়া দান আমরা অবহেলায়, ইচ্ছাকৃতভাবে, অলসতায়, প্রতারণার কর্মে, নিজ স্বার্থ চিন্তায় ও কর্মে, অন্যের বিরূদ্ধে, অব্যবহৃত অবস্থায় রাখিয়া, অন্যের অপকার হয় এমন চিন্তায় বা কর্মে অবশ্যই ব্যবহার করিব না। বরং গভীর প্রেম, ভালবাসা এবং নিঃস্বার্থ সেবার মাধ্যমে সর্বোৎকৃষ্ট সহযোগিতাদান করিব এবং নবজীবনের আশার আলো দেখাইয়া অবহেলিত প্রতিবন্ধী-জরা-রোগাক্রান্তদের মুখে আনন্দের হাসি ফুটাইবার জন্য আপ্রাণ করিতে নিষ্পাপ থাকিব।”

ফিজিওথেরাপি কি ?

সহজ ভাষায় ইহাকে ‘শারীরিক চিকিৎসা’ বলা হয়। ইহা আধুনিক চিকিৎসা এবং গবেষণা বিজ্ঞানের এক বিশেষ ধরণের চিকিৎসা পদ্ধতি। যাহা প্রচলিত ঔষধ প্রয়োগের পাশাপাশি প্রাকৃতিক উপায় অবলম্বনপূর্বক শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন ধরণের জটিল রোগ ও দুর্ঘটনার কারণে পঙ্গুত্বের হাত হইতে সুরক্ষাপ্রাপ্তি এবং নবজীবনলাভের অভুতপূর্ব অত্যাধুনিক চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন চিকিৎসা বিজ্ঞান।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা কেন অপরিহার্য ?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ( ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গ্যানাইজেশান )-এর জরিপ মতে সমগ্র পৃথিবীর প্রতি (১০) দশ জন মানুষের মধ্যে (১) এক জন কোনও না কোনভাবে প্রতিবন্ধী। সুতরাং ইহা অতি সহজেই অনুমান করা যায় (১৬) ষোল কোটি জনসংখ্যার এই বাংলাদেশে (১৬০) এক শত ষাট লক্ষ্য মানুষ যে কোনও ভাবে প্রতিবন্ধী। এই সংখ্যা প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাইতেছে এবং ইহার কারণেই ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা জনগণের জন্য অত্যধিক গুরুত্বপুর্ণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বিজ্ঞান।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের কোন্ ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি আবশ্যিকভাবে প্রয়োজন ?

নিউরোলজী বা ব্রেইন- ¯œায়ুতন্ত্র – এর জটিলতার কারণে একজন ব্যক্তি প্রতিবন্ধীত্বের শিকার হইতে পারে। যে কোনও ব্যক্তি রোগের কারণে বা দুর্ঘটনার কারণে বা আঘাতজনিত কারণে বা অস্ত্রপোচার এর কারণে বা ভুল চিকিৎসার কারণে বা চিকিৎসায় অবহেলা, স্ট্রোকের কারণে প্যারালাইসিস বা প্রতিবন্ধীত্বের শিকার হইতে পারে। উক্ত প্যারালাইসিস বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির শরীরের মাংসপেশীর শক্তি, সকল জয়েন্টের সঠিক নিয়মে সচল রাখা, দৈনন্দিন কাজকর্ম করার ক্ষমতা, হাটা-চলা, নিজেকে অন্য কাহারও সাহায্য ভিন্ন সম্পুর্ণ নিজে নিজেই পরিচালনা করিয়া অন্ধকারময় অনিশ্চিত জীবন হইতে নতূন আশার আলোময় জীবন আবার ফিরিয়া পাইতে ফিজিওথেরাপির বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থা নাই।

অর্থপেডিক বা হাড়-জোড় মাংসপেশী – এর স্বাভাবিক কাজকর্মের জটিলতা বা অপারেশনের আগে ও পরে জটিলতামুক্ত করিয়া রোগীকে কার্যক্ষম এবং কর্মক্ষম করার জন্য ফিজিওথেরাপি অতি প্রয়োজন। শরীরের বিভিন্ন অংশে খেলাধূলা বা এক্সিডেন্টে বা আঘাত লাগিয়া হাড় ভাঙ্গিয়া যাইতে পারে। মাংসপেশী এবং বিভিন্ন জয়েন্টে মারাত্মক ব্যাথা অনুভূত হয়। অর্থপেডিক সার্জারীতে বা যেকোনও রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারির আগে এবং পরে তাহা জয়েন্ট বা মাংসপেশী যাহাই হউক না কেন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা গ্রহণ না করিলে সেই জয়েন্ট বা মাংসপেশী অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্থ হইয়া যাইবে এবং প্রতিবন্ধীত্ব অর্জন করাও বিচিত্র নহে। স্পন্ডিলাইটিস্, স্পন্ডিলোসিস, অস্টিওআর্থরাইটিস্, রিউমোটয়েড আর্থরাইটিস, কোমর ব্যাথা বা লো-ব্যাক পেইন, পি.এল.আই.ডি, ফ্রোজেন শোল্ডার বা জ্বড় কাঁধ, মাসল্ স্ট্রেইন, লিগামেন্ট ¯েপ্রইন, এ্যাংকেল জয়েন্ট পেইন ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার অসুস্থ্যতা এবং সমস্যার কারণে হাটা-চলা নিত্যনৈমিত্তিক কাজকর্ম ও শরীরকে ব্যবহার করার সময় মারাত্মক যন্ত্রনাদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যন্ত্রণার কারণে আক্রান্ত অংশ নাড়াচাড়া করা অত্যধিক কষ্টসাধ্য হয় এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে একেবারেই নাড়াচাড়া করা সম্ভব হয় না। ধীরে ধীরে এই অবস্থা চলিতে থাকিলে অল্পদিনের মধ্যেই জয়েণ্ট পুর্ণ ভাজ বা খোলা কঠিন হয়। মাংসপেশী ব্যবহৃত না হওয়ার কারণে দুর্বল হইয়া শুকাইয়া যাইতে থাকে। অচিরেই বিকলাঙ্গত্ব দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীত্বও দেখা দিয়া থাকে। এই সকল ক্ষেত্রে অপারেশন বা ঔষধ প্রয়োগ ইত্যাদির পাশাপাশি ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা অত্যধিক উপযোগী। কোন কোনও ক্ষেত্রে কেবলমাত্র ফিজিওথেরাপি চিকিৎসাই পারে চিরতরে প্রতিবন্ধীত্বের হাত হইতে একজন ব্যক্তির জীবন রক্ষা করিতে।

থোরাসিক ডিজিস বা বক্ষব্যধি – এর ক্ষেত্রে ফুসফুসের জটিল সমস্যায় বা ফুসফুসের রোগে এবং ফুসফুসের অপারেশন বা থোরাসিক সার্জারির আগে ও পরে রোগীর ফুসফুস কফ্মুক্ত আছে কিনা এবং তাহা সম্পুর্ণ অপারেশনযোগ্য কিনা তাহার জন্য চেষ্ট ফিজিওথেরাপি অপরিহার্য। বৃদীং এক্সার্সাইজ অর্থাৎ নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যয়াম প্রশিক্ষনের মাধ্যমে রোগীর ফুসফুসের ভিতরের জমাট বাঁধা কফ্ কেমন করিয়া বাহির করিতে হয় এবং ফুসফুস ভর্তি করিয়া কিভাবে অক্সিজেন গ্রহণ করিয়া কার্বনডাই-অক্সাইড গ্যাস ফুসফুস হইতে বাহির করিয়া দিতে হয় যাহাতে ভবিষ্যতে আরও জটিলতর বক্ষব্যধিতে আক্রান্ত না হইতে হয় তাহার জন্য ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা একান্ত কার্যকরী এবং প্রয়োজনীও ব্যবস্থা।

কার্ডিওলজী বা হার্ট বা হৃদপিন্ড – এর চিকিৎসা বা অপারেশনের আগে ও পরে রোগীর ফুসফুসের অক্সিজেন ধারণক্ষমতা প্রয়োজন মত আছে কিনা বা কফ্ জমা আছে কিনা বা অপারেশনের পরে যে সকল শারীরিক অসমর্থতা বা অক্ষমতা দেখা দেয় যাহার কারণে শারীরিক বিকলঙ্গত্ব হইয়া থাকে। এমন কি ফিজিওথেরাপির অভাবে একজন রোগী অপারেশন পরবর্তী সময়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পুর্ণ ব্যবহার করায় বাধাগ্রস্থ হইতে পারে। অপারেশন পরবর্তী পর্যায়ে রোগী যখন ‘ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে’ (আই.সি.ইউ. অথবা সি.সি.ইউ-তে) থাকে তখন যদি ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা প্রদান করা না হয় তাহা হইলে সেই রোগীর অবশ্যই পরবর্তী সময়ে বক্ষব্যধি (শ্বাসকষ্ট) বা শারিরীক বিকলঙ্গত্ব বা ডিফরমিটি স্থায়ীভাবে দেখা দেওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে এবং সেইজন্য ফিজিওথেরাপি অনস্বীকার্য চিকিৎসা। অপারেশনের পরবর্তি সময়ে রোগীর হাটা-চলা, অপারেশনের অংশ বা সেই সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কোনওধরণের বিকলাঙ্গত্ব ব্যতীতই যাহাতে সঠিকভাবে সুস্থ্যভাবে ব্যবহার করিতে পারে তাহার নিশ্চয়তার জন্য অবশ্যই ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা প্রয়োজন।

ইন্টারনাল মেডিসিন – বিভিন্ন রোগের কারণে শারীরিকভাবে মাংসপেশী দুর্বল হইয়া থাকে এমনকি প্যারালাইসিস বা প্রতিবন্ধীত্বও দেখা দেয়। অনেকদিনের রোগ-ভোগের কারণে শরীরের জয়েন্ট-এর নাড়াচাড়া সম্পুর্ণ মাত্রায় করিতে বাধাসৃষ্টি হয়। বিভিন্ন মাংসপেশী সঠিকভাবে ব্যবহৃত না হওয়ার কারণে টাইট বা শক্ত বা খাটো বা কন্ট্রাকচার-এ পরিণত হয় তাহাতে মাংসপেশী সঠিক পর্যায়ে লম্বা হইতে পারেনা। মাংসপেশী অনেকদিন কর্মক্ষম না থাকার কারণে দুর্বল হইয়া পরে। মাংসপেশী কাজ করিতে না পারার কারণে দুর্বল হইয়া শুকাইয়া যায়। এই সকল সমস্যার হাত হইতে রক্ষা পাইতে একজন রোগীকে অবশ্য অবশ্যই ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা করিতে হইবে।

পেডিয়াট্রিক বা শিশু রোগ – এর কারণে শিশু বয়সে বিভিন্ন ধরণের রোগের কারণে প্রতিবন্ধীত্ব বা প্যারালাইসিস বা শারিরীক বিকলঙ্গত্ব বা অক্ষমতা দেখা দিয়া থাকে বা আক্রান্ত হইয়া থাকে। অশিক্ষিত এবং অনভিজ্ঞ ধাই দ্বারা সন্তান প্রসব করাইবার সময় বা খুব সমস্যাসঙ্কুল প্রসবে একটি সন্তান মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হইয়া একত্রে অনেকগুলি সমস্যা লইয়া প্যারালাইসিস হইতে পারে। আমাদের দেশে (সি.পি) সেরেব্রাল পালসি এবং বিভিন্ন ভাইরাসের আক্রমনে অগণিত শিশু মারাত্মকভাবে প্রতিবন্ধীত্বের শিকার হয়। শরীরের বিভিন্ন জয়েন্ট টাইট বা শক্ত হওয়ার কারণে বিকলাঙ্গত্ব বা ডিফর্মিটি দেখা দেয়। পরবর্তীতে একটি শিশুকে হাটা-চলা বা প্রাত্যহিক কাজকর্ম করা বা নিজেকে পরিচালনা করিয়া কর্মক্ষম থাকার জন্য ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার বিকল্প কোনও কার্যকরী চিকিৎসা নাই।

গাইনোকলজী বা ধাত্রী – বিভাগে গর্ভধারিণী মা অন্তসত্বাকালীন শ্বাস-প্রশ্বাস, কোমর এবং শরীরকে কিভাবে ব্যবহার করিবেন সেই ব্যাপারে অজ্ঞ থাকেন। তাহারা সকল ক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি ব্যবহারে সচেষ্ট থাকেন না। গ্রামের মা অজ্ঞতা এবং সাংসারিক কাজকর্মের কারণে তুলনামূলকভাবে প্রসবকালীন জটিলতা ও সমস্যায় ভুগিয়া থাকেন যাহার ফলশ্র“তিতে একটি বিরাট সংখক নবজাতক মারা যায় এবং আরও একটি বড় অংশ মাতৃ গর্ভ হইতেই প্রতিবন্ধী হইয়া জন্মলাভ করে। অন্তসত্বাকালীন এই সকল মা তাৎক্ষণিকভাবে তাহাদের কোনও সমস্যার কথা না বলিলেও পরবর্তী জীবনে শারীরিক বিভিন্ন ধরণের সমস্যা লইয়া দুর্বিসহ জীবনযাপন করেন। অতএব, অন্তসত্বাকালীন, প্রসবকালীন এবং প্রসব পরবর্তীকালীন মা সুন্দর শরীর ও স্বাস্থ্য লইয়া ভবিষ্যত জীবন অতিবাহিত করিতে পারেন এবং একটি সুস্থ-সবল সন্তানলাভ করেন সেইজন্য ফিজিওথেরাপি একটি গুরুত্বপুর্ণ চিকিৎসা ব্যবস্থা।

জেনারেল সার্জারী – এর ক্ষেত্রে বিভিন্ন পদ্ধতির অপারেশনের আগে এবং পরে মাংসপেশী বা টিস্যুর বা জয়েন্টের স্বাভাবিক কাজকর্মের সমস্যার সৃষ্টি হয়। এমন কি শ্বাস-প্রশ্বাসের মারাত্মক বিঘœ সৃষ্টি হইতে পারে। ইহাদের মধ্যে একটি বড় অংশের রোগী অবহেলা বা সঠিক উপদেশ বা সেবার অভাবে প্রতিবন্ধীত্ব বা বিকলাঙ্গত্ব লইয়া জীবনধারণ করেন। জীবনে শক্ত-সামর্থ থাকিয়া কাজকর্মের মধ্য দিয়া নিজেকে পরিচালিত করার জন্য ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ।

জেরিয়াট্রিক বা বার্দ্ধক্যজনিত – জ্বরা ব্যধির কারণে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং ইহার বিভিন্ন অংশে ব্যথা, মাংসপেশীর শক্তির ঘাটতি, মানসিক ইচ্ছাশক্তির ঘাটতি, বিভিন্ন জয়েন্টের ব্যাথা ও জড়তা ইত্যাদির কারণে একজন প্রবীন ব্যক্তি চলৎশক্তি হারাইয়া ফেলেন। এমনকি প্রায় প্রতিজনের বুকের মধ্যে কফের ঘড়ঘড় শব্দ হয়। ফুসফুসে কফ্ জমা থাকার কারণে নানারূপ বক্ষব্যধি আক্রমন করে। (৫০) পঞ্চাশোর্ধ যে কোনও বয়স্ক ব্যক্তিকে কোনও না কোনও একটি অথবা উল্লেখিত বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত হইয়া দুর্বিসহ এবং দুঃসহ জীবন যাপন করিতে হইতেছে। অতএব, এই প্রবীন ব্যক্তিদের ব্যাথামুক্ত স্বাভাবিক চলাফেরা, নিশ্বাস-প্রশ্বাস নির্বিঘœ করিয়া শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য ফিজিওথেরাপি একটি উপযোগী এবং উল্লেখযোগ্য চিকিৎসা।

লাঙস্ কনজেশান বা ফুসফুসের কফ্জনিত – কারণে নিশ্বাস-প্রশ্বাস মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফুসফুস ভর্তি কফ্ জমা থাকার কারণে নিশ্বাস-প্রশ্বাস অত্যন্ত হালকা ও বাধাগ্রস্থ হইয়া থাকে। যাহার কারণে নিশ্বাসের সহিত অক্সিজেন ফুসফুসের ভিতরে পরিমাণ মত যাইতে পারে না। সেই জন্য অক্সিজেন এবং কার্বন্ডাইঅক্সাইড গ্যাসীয় অদল-বদল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রক্তের সহিত মিশ্রিত হইতে এবং রক্ত হইতে কার্বন্ডাইঅক্সাইড বাহির হইয়া ফুসফুসের মাধ্যমে নিশ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়া দ্বারা বাহির হইয়া আসিতে বাধাগ্রস্থ হয়। রক্তে অক্সিজেনের ভাগ কম হওয়ার কারণে সঠিক পরিমাণ অক্সিজেন মিশ্রিত রক্ত সম্পুর্ন শরীরে সঞ্চালিত হইতে পারে না। ফলে শরীরের প্রতিটি অংশ প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঠিকভাবে পরিচালিত হইতে মারাত্মকভাবে বিঘিœত হয়। সঠিক পরিমাণ অক্সিজেন মিশ্রিত রক্ত ব্রেইনে সঞ্চালিত না হইলে বা বাধাগ্রস্থ হইলে ¯œায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এমনকি এ্যাজমা, ব্রংকাইটিস, ব্রংকিএ্যাকটিসিস, এমফিসিমা, নিউমোনীয়া, ব্রংকোনিউমোনীয়া ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের রোগে ফুসফুস আক্রান্ত হইতে পারে এবং এই সকল সমস্যা দূরীভূত করার জন্য কফ্মুক্ত লাঙস্ বা ফুসফুস রক্ষণাবেক্ষণ করিতে বিভিন্ন পদ্ধতিতে ( পশ্চারাল ড্রেইনেজ ) ফুসফুসের ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব অপরিসীম। আই,সি, ইউ অথবা সি.সি.ইউ-তে যেসকল রোগী চিকিৎসালাভের জন্য ভর্তি হইয়া থাকে তাহাদের প্রায় প্রত্যেকেরই ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা আবশ্যিকভাবে প্রয়োজন।

লীম্ব ফিটিং সার্জারী বা নকল হাত, পা সংযোজনের অস্ত্রপোচার – এর ক্ষেত্রে রোগীর হাত বা পা হাঁটুর উপরে বা নীচে বা কনুইয়ের উপরে বা নীচে রোগ বা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অপারেশনের মাধ্যমে কাটিয়া বাদ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে উক্ত কর্তনকৃত অংশে নকল হাত বা পা সংযোজন করিয়া ব্যবহার করার জন্য কর্তনকৃত অংশের অগ্রভাগের মাংসপেশী এবং অন্যান্য জয়েন্টগুলি যাহাতে সুন্দর ও সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয় এবং নকল অঙ্গ যাহাতে সংযোজন করা সহজতর হয় সেইজন্য ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা প্রয়োজন। এই সকল নকল অঙ্গ-প্রতঙ্গ ব্যবহার করার সময় অন্যান্য সহযোগী মাংসপেশীও যাহাতে শক্তিশালী হয় এবং পরবর্তীতে শরীরে ভারসাম্য বা ব্যালেন্স ঠিক রাখিয়া চলিতে ও কাজ করিতে পারে সেইলক্ষ্যে বিশেষ পদ্ধতিতে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা প্রয়োজন।

বার্ণ ডিপার্টমেন্ট বা পোড়া বিভাগ- সমগ্র জনগোষ্ঠির একটি বড় অংশ বিভিন্ন কারণে শরীরের বিভিন্ন অংশে পোড়ার সমস্যা লইয়া হাসপাতালে অথবা ক্লিনিকে চিকিৎসার জন্য উপস্থিত হন। পুড়িয়া যাওয়ার কারণে শরীরের চামড়া, মাংসপেশী, অন্যান্য টিস্যু, রক্তের শিরা, ধমনী, শ্বাসনালী ইত্যাদি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমন ক্ষতিগ্রস্থ হইয়া থাকে যে, মাংসপেশী ও চামড়ার জড়তা বা সংকুচিত বা কনট্রাকচার হইয়া যাওয়ার কারণে আক্রান্ত অংশের জয়েন্টও ভাঁজ হইয়া বাঁকা হইয়া যায়। এইভাবে সংকুচিত মাংসপেশী, চামড়া ও জয়েন্ট স্বাভাবিক কাজকর্ম করিতে পারেনা, পরবর্তীতে বিকলঙ্গত্ব বা প্রতিবন্ধীত্বের শিকার হয়। অসংখ্য ব্যক্তিকে বিকলাঙ্গ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ লইয়া সারাজীবন অন্যের উপর নির্ভর করিয়া বাঁচিয়া থাকিতে হয়। পুড়িয়া যাওয়া অংশের চামড়া, মাংসপেশী, লিগামেন্ট জয়েন্ট যাহাতে সম্পুর্ণভাবে স্বাভাবিক কর্মক্ষম ও সুস্থ্যভাবে ব্যবহার করা যায় সেই জন্য ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা প্রয়োজন। আগুনে, গরম পানিতে, তৈলে, এসিডে, বরফে বা ইলেকট্রিসিটির কারণে পোড়া রোগীর চামড়া, মাংসপেশী বা জয়েন্ট যাহাতে পুড়িয়া যাওয়ার পর হাসপাতাল বা ক্লিনিকের বার্ণ ডিপার্টমেন্ট বা পোড়া বিভাগে (যদি থাকে) চিকিৎসাকালীন ক্ষতিগ্রস্থ না হয় অথবা বিকলাঙ্গত্বের শিকার না হয় সেইজন্য ফিজিওথেরাপি অত্যধিক প্রয়োজনীয় চিকিৎসা। পুড়িয়া যাওয়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অপারেশনের মাধ্যমে আবার যতটুকু সম্ভব সঠিক আদলে ফিরাইয়া আনার আগে এবং পরে উক্ত অপারেশনের জায়গাটি যাহাতে অপারেশনের পরবর্তি সময়ে নির্বিঘেœ খোলা-ভাজ করা এবং ব্যবহার করা সহজতর হইতে পারে তাহার জন্য ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার বিকল্প নাই।

আই.সি.ইউ. (ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিট) এবং সি. সি. ইউ (করনারী কেয়ার ইউনিট) – যে সকল রোগী ব্রেইন স্ট্রোক বা ¯œায়ুতন্ত্রের সমস্যার কারণে অজ্ঞান হইয়া আই.সি.ইউ-তে অথবা সি. সি. ইউ-তে ভর্তি হন তাহাদের ফুসফুসের সঠিকভাবে নিশ্বাস- প্রশ্বাস বজায় রাখা, অজ্ঞান অবস্থায় ফুসফুসের ভিতর হইতে কফ্ বাহির করা, হাত ও পায়ের সকল মাংসপেশী ও জয়েন্ট এর স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা বজায় রাখার জন্য ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা অপরিহার্য্য। হার্ট সার্জারী, থোরাসিক সার্জারী, জেনারেল সার্জারী এবং অন্যান্য রোগের কারণে রোগীকে আই.সি.ইউ-তে অথবা সি.সি.ইউ-তে ভর্তি করা হয়। উক্ত প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রে একইভাবে ফিজিওথেরাপি অত্যন্ত জরুরী এবং আবশ্যিক চিকিৎসা।

লেপ্রোসি বা কুষ্ঠ – রোগের কারণে রোগীর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। শরীরের বিভিন্ন অংশ ¯œায়ুতন্ত্রের অসাড়তার কারণে প্যারালাইসিস বা প্রতিবন্ধীত্ব দেখা দেয়। ধীরে ধীরে উক্ত প্যারালাইসিস অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ডিফরমিটি বা বিকলাঙ্গত্বের শিকার হয়। মাংসপেশী এবং লিগামেন্ট মারাত্মকভাবে সঙ্কুচিত বা কন্ট্রাক্চার হয়। রিকনসট্রাকটিভ্ সার্জারীর মাধ্যমে কন্ট্রাকচার বা সঙ্কুচিত মাংসপেশী, হাড় এবং জয়েন্টের ডিফরমিটি যতদূর সম্ভব সঠিক পর্যায়ে স্থাপন করার চেষ্টা করা হয়। রিকনসট্রাকটিভ্ সার্জারীর আগে এবং পরে আক্রান্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি আবার কার্য্যক্ষম করিয়া তুলিতে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা অত্যধিক গুরুত্বপুর্ণ।

টর্চার্ড এন্ড ট্রমা বা নির্যাতনের ক্ষেত্রে – পুলিশ, বি,ডি,আর, মিলিটারী, ক­ীন হার্ট, যৌথ বাহিনী, র‌্যাট, জেলখানায়-হাযতে, সন্ত্রাসী, বাবা-মা কর্তৃক সন্তানকে শারীরিক নির্যাতন, গৃহকর্তা-কর্ত্রী কর্তৃক গৃহভৃত্তকে, অফিস, কর্মস্থলের অধীনস্থ কর্মচারী, বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হইয়া থাকে। এই অমানবিক নির্যাতনের ফলে সকল আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের বিভিন্ন জয়েন্ট এবং মাংসপেশী প্রচন্ড আঘাতজনিত কারণে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ইহাদের মধ্যে অধিকাংশ জনই প্যারালাইসিস বা পঙ্গুত্বের শিকার হয়। অন্য সকলেই বিভিন্ন মাংসপেশীতে এবং জয়েন্টে প্রচন্ড ব্যাথা লইয়া ধীরে ধীরে প্রতিবন্ধীত্বের দিকে ধাবিত হইতে থাকে। ইহাদের মধ্যে বিরাট একটি সংখ্যার শরীরের বিভিন্ন অংশের হাড় ভাঙ্গিয়া যাওয়ার কারণে এবং বিনা চিকিৎসায় অথবা অপর্যাপ্ত চিকিৎসার কারণে বিভিন্ন জয়েন্ট শক্ত হইয়া যায় এবং সঠিকভাবে ভাঙ্গা হাড় জোড়া না হইয়া মারাত্মক অঙ্গহানী হইয়া থাকে এবং এক অকর্মন্য-অথর্ব ব্যক্তিতে পরিণত হয়। এই সকল রোগীর ব্যথা-বেদনা, জয়েন্টের সঠিকভাবে নাড়া-চাড়া করা, প্রতিবন্ধীত্বের হাত হইতে রক্ষা করিয়া আলোময় জীবনে ফিরাইয়া আনিতে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসাই সর্বোত্তম চিকিৎসা পদ্ধতি।

এইড্স রোগে- যেসকল রোগী এইড্সে আক্রান্ত হয় তাহাদের শারীরিক কর্মক্ষমতা ধীরে ধীরে লোপ পাইতে থাকে। শরীরের সকল জয়েন্টে জ্বড়তা, সকল মাংসপেশী ক্রমান্বয়ে দুর্বল হইয়া শরীরের চলৎশক্তি নিস্তেজ হইয়া একটি জ্বড় পদার্থে পরিণত হয়। অতি সল্প সময়ের মধ্যেই সকল মাংসপেশী শুকাইয়া এবং সংকুচিত হইয়া নড়া-চড়া করাও দুস্বাধ্য হইয়া যায়। বুকের পাঁজরের মাংসপেশীগুলি দুর্বল হইয়া নিশ্বাস-প্রশ্বাস ধীর গতিতে হইতে থাকে। ফলে ফুসফুসের মধ্যে কফ্ জমা হইয়া বিভিন্নধরণের বক্ষব্যধিতে আক্রান্ত হয়। এইডস্ রোগীদের দ্রুত জয়েন্টের জ্বড়তা, মাংসপেশীর দুর্বলতা, শুকাইয়া ও সংকুচিত হইয়া যাওয়া এবং ফুসফুসের কফ্মুক্ত এবং বিভিন্নধরণের বক্ষব্যধি হইতে রক্ষা করিয়া যাহাতে আরও কিছুদিন চলা-ফেরা করিতে সক্ষম হয় সেইজন্য ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা অপরিহার্য্য।

আর্সেনিক রোগে- ইদানিং আমাদের দেশে একটি বিরাট সংখ্যক জনসাধারন আর্সেনিক রোগে আক্রান্ত। তাহাদের অধিকাংশজনেরই হাতে এবং পায়ে ঘা হইয়া থাকে। আক্রান্ত হাত এবং পায়ের চামড়া অত্যন্ত অমসৃন এবং খস্খসে হইয়া থাকে এবং সঠিকভাবে অনুভূতি ও শক্তি থাকে না। হাত এবং পায়ের আক্রান্ত অংশের স্বাভাবিক কাজ-কর্ম ব্যহত হয়। এইসকল আর্সেনিক আক্রান্ত ব্যক্তিদের হাত ও পায়ের শক্তি এবং অনুভূতি যাহাতে স্বাভাবিক এবং স্বতেজ হয় তাহার জন্য ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা।

ফিজিক্যাল মেডিসিন – বিভাগে যে-সকল রোগী চিকিৎসার জন্য উপস্থিত হন তাহাদের মধ্যে প্রায় সকল রোগীই বিভিন্ন ব্যাথা ও প্যারালাইসিস বা প্রতিবন্ধীত্বের শিকার। এই সকল রোগীর জন্য ফিজিওথেরাপি চিকিৎসাই একমাত্র এবং উপযুক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা।

রিহ্যাবিলিটেশন মেডিসিন বা পুনর্বাসন চিকিৎসা – একজন ব্যক্তি যখন বিভিন্ন অসুস্থতার কারণে, জন্মগতভাবে, কল-কারখানা,রাস্তাঘাট, কাজকর্মের ক্ষেত্রে এ্যাক্সিডেন্টের কারণে প্যারালাইসিস বা প্রতিবন্ধীত্বের শিকার হন অথবা বিভিন্ন রোগের কারণে শরীরের বিভিন্ন অংশে এবং জয়েন্টে ব্যথা হইয়া জয়েন্ট শক্ত হইয়া যায়। অথবা প্রাচীন প্রাচীনা ব্যক্তি নানাধরণের জ্বরা ব্যধিতে আক্রান্ত হইয়া বার্ধক্যের চাপে চলাফেরা-কাজকর্ম করিতে অক্ষম হন। অন্য কাহারও সাহায্য ভিন্ন কোনও কাজ করিতে সমস্যার সম্মুখীন হন তাহাদের প্রত্যেক ধরণের ব্যক্তিকে সমাজের অন্ধকারময় অভিশপ্ত জীবন হইতে একজন কর্মক্ষমোপযোগী সদস্য হিসাবে আবার প্রতিষ্ঠিত করিতে বিভিন্ন পেশার পুনর্বাসন কর্মীর প্রয়োজন হইয়া থাকে। ইহাদের শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সকল যাহাতে সঠিকভাবে ব্যবহার করিতে পারে, নিজের শরীরকে হাটা-চলা, কাজকর্মের মধ্যে ব্যস্ত রাখিতে পারে, সেইজন্য শরীরের মাংসপেশীর শক্তি, সমস্ত ক্ষতিগ্রস্থ জয়েন্টের সঠিক পর্যায়ে চলাচল ও মুক্ত রাখা, শরীরের ভারসাম্য ও ওজন ব্যবহার করিয়া নিজেকে পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরী এবং গুরুত্বপুর্ণ। যাহারা হাটা-চলা করার উপযোগিতা হারাইয়া ফেলেন বা চিকিৎসার পরও তেমন উন্নতি হয় না তাহাদের বিভিন্ন সহযোগী মাধ্যম বা ডিভাইস্ বা বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে চার দেওয়ালের ভিতরের বিছানা হইতে বাহির করিয়া উন্মুক্ত আকাশের নীচে লইয়া আসিতে যেমন হুইলচেয়ারের প্রয়োজন তেমনি একজনকে ক্র্যাচ্ বা ক্যালিপার বা ব্রেস্ দ্বারা হাটা চলা করার ট্রেনিং বা প্রশিক্ষন দ্বারা চলাফেরা করার সাহায্য করা সম্ভব। এই সকল ক্ষেত্রে অন্যান্য সকল পুনর্বাসনকর্মীর যেমন প্রয়োজন তেমনি সবচাইতে গুরুত্বপুর্ণ এবং একান্ত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ফিজিওথেরাপি। শরীরের মাংসপেশীর শক্তি, জয়েন্টের সঞ্চালন ক্ষমতা, শরীরের ব্যালেন্স বা ভারসাম্যতা, শরীরের ওজন সঠিকভাবে ব্যবহার করিয়া চলাফেরা করার জন্য কেবলমাত্র ফিজিওথেরাপি চিকিৎসাই প্রধান এবং মুখ্য চিকিৎসা।

স্পোর্টস্ এন্ড গেমস বা খেলাধূলা – এর ক্ষেত্রে প্রতিনিয়তই শরীরের বিভিন্ন অংশের উপর অত্যধিক চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে শরীরের বিভিন্ন জয়েন্ট মচকাইয়া, হাড় ভাঙ্গিয়া, মাংসপেশী হেঁচকা টান লাগিয়া, মাংসপেশীতে হঠাৎ খিচুনী ধরিয়া শক্ত বা ক্র্যাম্প হইয়া মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি হইয়া থাকে। এমনকি কিছু কিছু খেলাধুলা আছে যাহা অত্যন্ত ভয়াবহ। জীবনের ঝুকি থাকে একশত ভাগ। মাঝে মধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটিয়া বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে আঘাত লাগিয়া কর্মক্ষমতা রহিত হইয়া যায়। মেরুদন্ডের আঘাতের কারণে একজন ব্যক্তি প্রতিবন্ধীত্বের বা প্যারালাইসিস-এর শিকার হইতে পারে। এইরূপ মচকানো, হাড় ভাঙ্গিয়া যাওয়া, মাংসপেশীতে টান লাগা, মাংসপেশীতে ক্র্যাম্প হওয়া, মেরুদন্ড ভাঙ্গিয়া প্যারালাইসিস হইয়া যাওয়া এমন একটি সমস্যা যাহা কেবলমাত্র ঔষধ বা অপারেশনের মাধ্যমে চিকিৎসা করিলেই সুস্থ্য হওয়া যায় না। প্রতিটি সমস্যার চিকিৎসায় ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরী এবং অত্যধিক কার্যকরী। বিদেশের যে কোনও খেলাধূলা বা স্পোর্টসে বা ক্লাবে ফিজিওথেরাপিষ্ট অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসক। বাংলাদেশেও ইদানিং অলেম্পিক এ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, বাংলাদেশ ফুটবল এ্যাসোসিয়েশন জাতীয় দলের জন্য দেশী এবং বিদেশী ফিজিওথেরাপিষ্ট নিয়োগ দেওয়া হইয়াছে এমন কি বিভিন্ন ক্লাব কর্তৃপক্ষ ফিজিওথেরাপিষ্ট নিয়োগদান করিতেছেন যিনি খেলাধূলা সংক্রান্ত যে কোনও আঘাতের ব্যাপারে তাহারাই বিশেষজ্ঞ মতামত এবং চিকিৎসা প্রদান করিবেন।

ফিজিওথেরাপির রোগীদের চিকিৎসা কে করিবেন ?

সরকারী এবং বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অনুমোদিত ফিজিওথেরাপি কলেজ বা প্রতিষ্ঠানে এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে পরিচালিত পুর্নাঙ্গ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা বিজ্ঞানে উত্তীর্ণ ব্যক্তিকে ‘ফিজিওথেরাপিষ্ট’ উপাধি দেওয়া হয়। কেবলমাত্র এবং একমাত্র শিক্ষিত ফিজিওথেরাপিষ্টগণই ফিজিওথেরাপির রোগীদের চিকিৎসা করিবার বৈধ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। চিকিৎসা বিজ্ঞানে বা চিকিৎসা শাস্ত্রের অন্য যে কোনও বিষয়ে বা বিভাগের চিকিৎসক হইলেও তিনি বা তাহারা ফিজিওথেরাপি চিকিৎসায় উত্তীর্ণ লাভ না করিলে তিনি বা তাহারা ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা করার বৈধতা রাখেন না। পৃথিবীতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের কার্যক্রম ছোট হইয়া গিয়াছে। চোখের ডাক্তার হাড়-ভাঙ্গা একজন রোগীর চিকিৎসা না করিয়া যেমন অর্থপেডিক বা হাড়জোড় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিকট প্রেরণ করেন ঠিক তেমনি ফিজিওথেরাপির যেকোনও রোগীকে সরাসরি একজন ফিজিওথেরাপিস্টের নিকট রেফার বা প্রেরণ করা উচিৎ। যদি কেহ ফিজিওথেরাপিষ্ট না হইয়া ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা করিতে চেষ্টা করেন তাহা অবৈধ তো হইবেই সর্বোপরি রোগীর মারাত্মক ক্ষতিও করিতে পারেন। ইহা ভাবিলে চলিবে না যে, ফিজিওথেরাপি এমন আর কি বিষয়, ইহার জন্য অত পড়াশুনার প্রয়োজন কি ? চিকিৎসা ক্ষেত্রের অন্যান্য অধিকাংশ চিকিৎসকগণ কার্য্যত করিয়া এবং বলিয়া থাকেন যে, “আমরা অর্ডার করিব আর তাহারা আমাদের নির্দেশ অনুযায়ী চিকিৎসাদান করিবে এই বিষয়ে ফিজিওথেরাপিষ্টদের নিজেদের চিকিৎসা বিষয়ক মতামতদান করিবার বা স্বাধীনভাবে চিকিৎসা করিবার কোনই অধিকার নাই এবং থাকিতেও পারে না।” অথচ আশ্চর্যের বিষয় এই যে, যাহারা ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা-শাস্ত্রই পড়াশুনা করেন নাই এবং কিভাবে চিকিৎসাদান করিতে হয় তাহা জানেনই না তাহারাই তাহাদের প্যাডে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা সংক্রান্ত মনগড়া প্রেসক্রিপশান লিখিয়া থাকেন, যাহা তাবৎ চিকিৎসা বিজ্ঞান-শাস্ত্রের প্রফেশন্যাল এথিক্সের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তাই উল্লেখিত ফিজিওথেরাপি চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যায়ন করিয়া সুশিক্ষিত ফিজিওথেরাপিস্ট উপাধিতে ভুষিত হওয়ার পরই কেবলমাত্র বৈধ ফিজিওথেরাপিস্ট হিসাবে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা প্রদান করিতে পারেন। বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপির নাম ভাঙ্গাইয়া ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার নামে বিভিন্ন স্থানে রোগীদের প্রতারণা করা হইতেছে। যাহা মানবতার ঘোর বিরোধী কাজ, অবিলম্বে এই ধরণের প্র্যাক্টিস আইন করিয়া বন্ধ করা উচিৎ।

বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপির অবস্থা ঃ

বর্তমানে ঢাকাসহ কোনও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলিতে সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত সুশিক্ষিত ফিজিওথেরাপিস্ট নাই। যাহারা ফিজিওথেরাপি চিকিৎসায় নিয়োজিত আছেন তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ ফিজিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট অথবা অনেকদিন যাবৎ ফিজিওথেরাপি বিভাগে কর্মরত, তাহারাই রোগীদের যথাসাধ্য সহযোগিতা করিতেছেন এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখিতেছেন।
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল এবং অন্যান্য বড় বড় হাসপাতালে কোনও বৈধ এবং সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত শিক্ষিত ফিজিওথেরাপিষ্ট কর্মরত নাই। কেবল দুই একটি সরকারী হাসপাতালে নামমাত্র গুটি কয়েক সুশিক্ষিত ফিজিওথেরাপিষ্ট কর্মরত আছেন। সমগ্র পৃথিবিতে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসাশাস্ত্রে অধ্যায়ন করিবার জন্য ফিজিওথেরাপিতে ব্যাচেলর, মাস্টারস এবং পি.এইচ.ডি. ডিগ্রী শিক্ষায় শিক্ষিত হইবার সুযোগ রহিয়াছে সেইখানে বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা-শাস্ত্রের অবমূল্যায়ন করিয়া হেয় করিবার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাইতেছে। বিভিন্ন হাসপাতালে ‘ফিজিওথেরাপি’ শব্দটির অপঘাত মৃত্যু ঘটাইবার প্রয়াস চালানো হইতেছে। পৃথিবীব্যপী এই অত্যাধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও পদ্ধতি দেশে যাহাতে বিলুপ্ত হইয়া যায় তাহারই জোর প্রচেষ্টা লক্ষ করা যাইতেছে। হাসপাতালগুলিতে ‘ফিজিওথেরাপি বিভাগ’ সাইনবোর্ড পাল্টাইয়া ফেলা হইয়াছে এবং হইতেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এবং সর্বোপরি অসহায় ও মারাত্মক পীড়া-কষ্টে আক্রান্ত রোগীদের সহিত ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার নামে প্রতারণা করা হইতেছে। অতএব, চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্য সকল সম্মানিত চিকিৎসকবৃন্দ এবং সম্মানিত সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট একান্ত বিনীত অনুরোধ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে তিনটি বিষয়ে চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যায়ন করার সুযোগ আছে, (১) ফিজিওথেরাপি, (২) এম. বি. বি.এস (৩) বি. ডি. এস। এম.বি.বি.এস এবং বি.ডি.এস চিকিৎসা বিজ্ঞানকে উচ্চে আসীন করা হইবে অথচ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা বিজ্ঞানকে নিম্নে আসীন করিয়া অতি তুচ্ছজ্ঞান করা হইতেছে, এইধরণের মানসিকতা অতিসত্বর এবং অবশ্যই পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। কারণ এই তিনটি চিকিৎসা বিজ্ঞান একই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক স্বীকৃত এবং একই চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে পরিচলিত ও মূল্যায়িত এবং সমমানের। অতএব দেশের অগণিত রোগে-শোকে, জ্বরা-ব্যধিতে আক্রান্ত রোগীদের বৃহত্তর স্বার্থে এবং সেবার সর্বোচ্চ সুযোগদান করার লক্ষ্যে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা ফিজিওথেরাপিস্টগণকেই করিবার সুযোগ প্রদান করিতে হইবে। ইহা ফিজিওথেরাপিষ্টদের অধিকার। সম্মানিত চিকিৎসকগণ আপনারা রোগীদের চিকিৎসার্থে আপনাদের স্ব-স্ব ক্ষেত্রে^ নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য দায়িত্ব পালন করিতেছেন যাহা সমাজের আপামর জনগণের যারপরনাই উপকার সাধিত হইতেছে। আমরাও ফিজিওথেরাপিস্টগণ আমাদের দায়িত্ব পালন করিয়া একজন অসহায় রোগীকে সর্বোচ্চ সেবাদান করিয়া তাহার মুখে হাসি ফুটাইবার শপথ গ্রহণ করিয়াছি। আমরা সকল রোগীর উপকারার্থে সকলে মিলিয়া রোগীদের সঠিক উপদেশ, চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন করার জন্য নির্লোভ এবং নিষ্পাপ হইতে স্বচেষ্ট থাকিব।

কোথায় ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যায়নের সুযোগ আছে ঃ

প্রতিনিয়তই ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণা হইতেছে, নিত্যনুতন পদ্ধতি আবিষ্কার হইতেছে, কত উৎকর্ষ সাধিত হইতেছে। পৃৃথিবীর সকল দেশে চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুষদ কর্তৃক ফিজিওথেরাপি চিকিৎসাশাস্ত্র শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত এবং ডীগ্রী প্রদান করা হইতেছে যাহা এম.বি.বি.এস এবং বি.ডি.এস-এর সমমানের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধীনে চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুষদ কর্তৃক অনুমোদিত এবং মূল্যায়ীত জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল (নিটোর, পূর্বে পঙ্গু হাসপাতাল), সেন্টার ফর দি রিহাবিলিটেশন অব দি প্যারালাইজড্ (সি.আর.পি.), স্টেট কলেজ অব হেল্থ সাইন্সেস, ঢাকাস্থ মহাখালী এবং রাজশাহীস্থ আই এইচ টি-তে, সাইক হইতে বি, এস, সি, ইন ফিজিওথেরাপি কোর্স পরিচালিত হইতেছে, গণ বিশ্ববিদ্যালয় অধীন বি.এস সি. ইন ফিজিওথেরাপি ডিগ্রী প্রদান করা হয়। বর্তমানে গণবিশ্ববিদ্যালয়ে “মাস্টার্স ইন ফিজিওথেরাপি” কোর্স-এর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হইতেছে। ইহা ব্যতীত ঢাকা, রাজশাহী, ঝিনাইদহ, বরিশাল, রংপুর, চট্টগ্রাম, বগুড়ায় ফিজিওথেরাপি টেকনোলজী কোর্স এবং ঢাকা কম্যউনিটি হাসপাতালে ডিপ্লোমা ফিজিওথেরাপি কোর্স পরিচালিত হইতেছে। কারিগরী শিক্ষাবোর্ডের অধীনে ডিপ্লোমা কোর্স পরিচালিত হইতেছে।

কে বা কাহারা ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা শাস্ত্র এর পাঠদান করিবেন ?

ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যায়ন এবং পাঠদানের ক্ষেত্রে অতি সতর্কতার সহিত পাঠ্যসূচী বা সিলেবাস নির্ধারণ করিতে হইবে যাহা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও অনুমোদিত। ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা শাস্ত্রের শিক্ষা কার্যক্রমে কেবলমাত্র ফিজিওথেরাপির পাঠ্যক্রম বা সাবজেক্টগুলি, ফিজিওথেরাপিষ্টগণই পাঠদান করিবেন অন্য কোন পেশা বা চিকিৎসক নন। তবে অন্যান্য পাঠ্য বিষয় বা সাবজেক্টগুলি যেমন, এ্যানাটমী, ফিজিওলজী, প্যাথলজী ইত্যাদি যাহার যে বিষয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতা আছে তিনি সেই বিষয়ে পাঠ্যসূচী বা সিলেবাস অনুযায়ী পাঠদান করিবেন। এই সকল বিষয়গুলি বা সাবজেক্টগুলি পাঠদান এবং শিক্ষাকার্যক্রম যাহাতে নিয়মতান্ত্রিক এবং শৃংখলার মধ্য দিয়া অগ্রসর হইতে পারে তাহার সমন্বয় রক্ষার জন্য শিক্ষা সমন্বয়কারী বা কোর্স-কোঅর্ডিনেটর একান্ত গুরুত্বপুর্ণ পদ। এই কোর্স-কোঅর্ডিনেটর-এর দায়িত্ব কেবলমাত্র একজন সুশিক্ষিত ফিজিওথেরাপিষ্টই পালন করিবেন। একাডেমিক কাউন্সিল নামে একটি কমিটি গঠন করা হইয়া থাকে যাহার সদস্যগণ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যায়নের জন্য যে সকল ছাত্র/ছাত্রী মনোনীত এবং নির্বাচন করিবেন তাহাদের কেবলমাত্র শিক্ষাগত যোগ্যতাই একমাত্র যোগ্যতা বিচার না করিয়া তাহাদের স্বাস্থ্য এবং শারীরিক সুঠাম গঠণও বিবেচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। কারণ, তাহাদের প্রত্যেককে অবশ্যই অত্যধিক পরিশ্রমের মাধ্যমে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা সেবাদান করিতে হইবে, এবং ইহার কোনও ব্যতিক্রম নাই। একাডেমীক কাউন্সিল ছাত্র নির্বাচন হইতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা এবং সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার সংরক্ষণ করেন। একাডেমীক কাউন্সিলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিভিন্ন পেশার বা বিভাগের সদস্য থাকিতে পারেন কিন্তু কোনক্রমেই ফিজিওথেরাপিষ্টের সদস্য সংখ্যা কম হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। যাহাদের ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা এবং ইহার পাঠ্যক্রম সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নাই তাহারাই যদি একাডেমীক কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য থাকেন তাহা হইলে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা শিক্ষা কার্যক্রমের অবমূল্যায়ন হওয়ার অথবা ক্ষতিগ্র¯হ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। ইহা একপ্রকার কামার হইয়া কুমারের কাজ করিবার সামিল যাহা সকল কর্ম নষ্ট হইবার নামান্তর।

ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ ঃ

উক্ত সাতটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে পাঁচ বৎসর মেয়াদী ( চার বৎসর একাডেমীক এবং এক বৎসর ইন্টার্ণশীপ), আই.এইচ.টি-তে তিন বৎসর মেয়াদি ফিজিওথেরাপি টেকনোলজী শিক্ষকার্যক্রমে শত শত ছাত্র ছাত্রী অধ্যায়ন করিতেছেন। অচিরেই শিক্ষাশেষে সুশিক্ষিত ফিজিওথেরাপিষ্টগণ বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে, বিভিন্ন এন,জি,ও, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে রোগীর সেবায় নিয়োজিত হইবেন। ক্রমেই জনগণ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা সম্পর্কে আরও অবগত হইবেন এবং ইহার প্রচার ও প্রসার ঘটিবে এবং ইহার উপকারিতা সম্পর্কে অবগত হইবেন। তখন চিকিৎসা বিজ্ঞানে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার ও শিক্ষাকার্যক্রমের উপর হইতে অপশক্তির প্রভাব দূরীভূত হইবে এবং ‘ফিজিওথেরাপি‘ স্বগৌরবে চিকিৎসা কার্যক্রমে অধিষ্ঠিত হইয়া আরও গভীরভাবে আর্তমানবের সেবায় নিয়োজিত হইবে।

সদাশয় সরকারের নিকট একান্ত বিনীতভাবে সুপারিশ এবং আবেদন করিতেছি

১। সম্মানীত সদাশয় সরকারের স্বাস্থ মন্ত্রী মহোদয়ের অঙ্গীকার অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থানে অনতিবিলম্বে “কলেজ অব ফিজিওথেরাপি” ভবন নির্মান এবং যতদিন পর্য্যন্ত কলেজ ভবন নির্মান শেষ না হয় ততদিন পর্য্যন্ত জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতলে ( নিটোর ) কলেজ অব ফিজিওথেরাপি-র শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করিতে হইবে।

২। বাংলাদেশের সকল ফিজিওথেরাপি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুষদ কর্তৃক অনুমোদিত এবং স্বীকৃত অবিকল সিলেবাস অনুযায়ী পাঠদান করা হউক এবং ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক ও পুণর্বাসন হাসপাতালের (নিটোর) ফিজিওথেরাপি শিক্ষা কার্যক্রমের আলোকে রচিত সিলেবাস ও কারিক্যুলাম।

৩। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত অসহায় রোগীদের বৃহত্তর স্বার্থে এবং ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা যাহাতে নগর, শহর এবং মফস্বল শহরগুলির হাসপাতালের রোগীরা পাইতে পারে তাহার জন্য প্রতিটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল হইতে দেশের অন্যান্য হাসপাতালগুলিতে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব হইতে পদাধিকার অনুযায়ী ‘প্রফেসর অব ফিজিওথেরাপি’ হইতে ক্রমান্বয়ে ‘ফিজিওথেরাপিস্ট’ পদ প্রবর্ত্তন করিয়া বৈধ শিক্ষিত ফিজিওথেরাপিষ্টগণকেই চিকিৎসার দায়িত্ব প্রদানের সুনির্দিষ্ট সরকারী ঘোষণাদান।

৪। যেহেতু, ফিজিওথেরাপি, এম.বি.বি.এস এবং বি.ডি.এস এই তিনটি পাঠ্য কার্যক্রম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধীন চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুষদ কর্তৃক স্বীকৃত, অনুমোদিত, মূল্যায়িত এবং সমমানের সেইহেতু, বাংলাদেশ মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের ন্যায় ফিজিওথেরাপি কাউন্সিল গঠণের সর্বসুযোগ এবং স্বীকৃতি প্রদান করা।

৫। যেহেতু, ফিজিওথেরাপি, এম.বি.বি.এস এবং বি.ডি.এস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধীন চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুষদ কর্তৃক স্বীকৃত, অনুমোদিত এবং মূল্যায়িত এবং সমমানের সেইহেতু, বাংলাদেশের সকল সরকারী-বেসরকারী হাসপাতাল, ক্লিনীক, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, এন,জি,ও,-তে শিক্ষিত ফিজিওথেরাপিষ্টগণের পদবীর মান, বেতন কাঠামো এবং সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা এম.বি.বি.এস এবং বি.ডি.এস চিকিৎসকদের ন্যায় হুবহু নির্ধারণ করার স্বনির্বন্ধ আবেদন এবং ন্যায্য দাবী জানাইতেছি।

৬। সমগ্র পৃথিবীর সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়া ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা শিক্ষা কার্যক্রমকেও অত্যাধুনিক পর্যায়ে উন্নীত করিতে হইবে। বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে “মাস্টারস ইন ফিজিওথেরাপি” এবং “ পি.এইচ. ডি. ফিজিওথেরাপি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করিতে হইবে যাহার বিভাগীয় প্রধান উচ্চ শিক্ষাপ্রাপ্ত ফিজিওথেরাপিষ্ট ব্যতীত চিকিৎসাক্ষেত্রের অন্যকোনও বিভাগের চিকিৎসককে অবশ্যই প্রদান করা যাইবে না।।

No Comments to “ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা অত্যাধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি স্বাধীন চিকিৎসা ব্যবস্থা”

Comments are closed.