ফ্যাটি লিভার থেকে বাঁচতে



  • Add Comments
  • Print
  • Add to Favorites

ফ্যাটি লিভারের সমস্যা ও তার কিছু সমাধান জানালেন কলকাতা পিয়ারলেস হাসপাতালের কনসালটেন্ট গ্যাসট্রোএনটেরোলজিস্ট ডাঃ সুজিত কর পুরকায়স্থ। বিভিন্নরকমের জটিল লিভারের অসুখে লিভার কোষে অনেক ক্ষেত্রেই চর্বি জমে যাওয়ার অবস্থা চিকিৎসাশাস্ত্রে একটা খুবই পরিচিত তথ্য। বেশ কিছু বছর আগে পর্যন্ত লিভার কোষে চর্বি জমেছে কিনা জানার মুখ্য উপায় ছিল লিভার বায়োপসি এবং তা করা হত লিভারের বিশেষ কী ধরনের সমস্যা আছে তা জানার জন্য। বর্তমান সময়ে আলট্রাসোনোগ্রাফির দৌলতে সাধারণ লোকের মধ্যে যে শব্দটি খুবই প্রচলিত হয়েছে সেটি হল ফ্যাটি লিভার। এই শব্দটি সাধারণ লোকেদের মধ্যে কখনও কখনও জাগায় উৎকণ্ঠা আর কেউ কেউ এটাকে করেন উপেক্ষা।

আজকাল অনেকেই চিকিৎসকের কাছে আসেন কারণ তাঁদের হয়তো, কোনও কারণে আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করা হয়েছে এবং তাতে যদিও বিশেষ কোনও কিছু ধরা পড়েনি, রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে যে ফ্যাটি লিভারের উল্লেখ আছে। এটাই কি সত্যিই বিশেষ উদ্বেগের কারণ আছে নাকি আমরা এটাকে উপেক্ষা করতে পারি। আমাদের আজকের প্রতিপাদ্য বিষয় হল এটি। প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো যাদের বিশেষ কোনও উপসর্গ নেই, সেই সব ক্ষেত্রে শুধুই ফ্যাটি লিভার দুশ্চিন্তার কারণ না হলেও কখনও কখনও এই দুশ্চিন্তা অমূলক নাও হতে পারে। সাধারণ জনমানুষের তাই এই ব্যাপারে ধারণা থাকা দরকার।
১. ফ্যাটি লিভার আসলে কী?
আমাদের শরীরে নানান স্থানে যেমন মেদ জমে, তেমনি যকৃতের কোষে অতিরিক্ত চর্বি জমলে তাকেই ফ্যাটি লিভার বলা হয় এবং তার ফলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে লিভারের কার্যকারীতা হ্রাস পায়। আগেই বলা হয়েছে যে বিভিন্ন কারণে লিভারের অসুখে লিভার কোষে চর্বি জমতে পারে। আমাদের দেশে যেমন হেপাটাইটিস-বি অথবা সি জনিত ক্রনিক হেপাটাইটিস-এর এক অন্যতম কারণ। এইসব জটিল রোগগুলো বাদ দিলে সাধারণ লোকেদের লিভারে ফ্যাট জমার পিছনে প্রধান কারণগুলোকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম পক্ষ অ্যালকোহলিক অর্থাৎ মদ্যপানের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং দ্বিতীয় পক্ষ নন অ্যালকোহলিক অর্থাৎ যারা মদ্যপান করেন না। যারা নিয়মিত মদ্যপান করেন, তাদের ফ্যাটি লিভার বা লিভার খারাপ হয়ে সিরোসিস হওয়ার সম্ভাবনা সবসময় বেশি। কিন্তু যারা হয়তো কোনওদিন মদ ছুঁয়েই দেখেননি, তাদের হতে পারে ফ্যাটি লিভার এবং তার থেকে সিরোসিস। তবে বর্তমানে সারা পৃথিবী জুড়েই অতিরিক্ত মদ্যপানের সঙ্গে লিভার কোষে চর্বি জমে যাওয়ার ব্যাপার এবং আরও অনেক জটিলতা হতে পারে জানা সত্ত্বেও এই সমস্যাটা এখন এক তীব্র আকার ধারণ করেছে। সমাজের সচ্ছলতার সঙ্গে ঢুকে পড়েছে অতিরিক্ত মদ্যপানের প্রবণতা এবং তার মধ্যে সমাজের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত লোকেরাও অংশ নিচ্ছেন অনেক সংখ্যায় এবং দুর্ভাগ্যবশত অনেক চিকিৎসকেরাও এর মধ্যে আছেন, আর আছেন মহিলারাও। বিদেশি সমস্ত ক্লাব এবং পাবে নিরাপদ মদ্যপানের মাত্রা নির্ধারিত করে দেওয়া আছে এবং সেগুলো সহজেই দৃশ্যমান। আমাদের দেশে এই ব্যাপারে সেই ধরনের সচেতনতার অভাব দেখা যায় এবং অ্যালকোহল সংক্রান্ত লিভারের অসুখ ক্রমবর্ধমান। তবে আরও একটা সমস্যা যেটা পরিলক্ষিত হচ্ছে সেটা হল নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি  লিভারের সমস্যা। এদের মধ্যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমস্যাটা জটিল আকার ধারণ করে না— যেটাকে শুধু নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বলা হয়। কিন্তু যাদের নন অ্যালকোহলিক স্টিয়াটো হেপাটাইটিস বা ন্যাশ (Nash) হয়, তাদের ক্ষেত্রে কিন্তু নানা ক্রনিক লিভারের রোগ হতে পারে। এমনকী লিভার ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এই দ্বিতীয় ধরনের ফ্যাটি লিভারকে যে কোনও সুপ্ত আগ্নেয়গিরির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।
২. কেউ সারা জীবন মদ্যপান করেননি, অথচ তার কি এই ভয়নক ন্যাশ হতে পারে?
নিশ্চয় হতে পারে।
এটাকে মেটাবলিক সিনড্রোমের একটা অংশ বলা যেতে পারে। আজকাল প্রায়ই উচ্চরক্তচাপ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হাইট্রাইগ্লিসারিড ও সেন্ট্রাল ওবেসিটি বা ভুঁড়ি বেরিয়ে আসার প্রবণতা দেখা যায়। দেখা গেছে যাদের নন-অ্যালকোহলিক স্টিয়াটো হেপাটাইটিস বা ন্যাশ হয়েছে, তাদের মধ্যে এই লক্ষণগুলি বর্তমান। তাছাড়া, ন্যাশের সঙ্গে দেহে একধরনের ইনসুলিন রেসিসটেন্স তৈরি হয় যা ডায়াটেবিসকে বাড়িতে তোলে এবং লিভারে চর্বি জমতে সাহায্য করে। তাই রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, ট্রাইগ্লিসারিডকে বশে রাখা, পেটে মেদ জমতে না দেওয়া এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে ন্যাশ থেকে দূরত্ব তৈরি করা সম্ভব।
৩. লিভারে যে একটা সংকট ঘনিয়ে আসছে, তার লক্ষণগুলি কীভাবে চেনা যায়?
সাধারণভাবে লিভারে যে ফ্যাট জমেতে সেটা আঁচ করা সবসময় সম্ভব নয়। কারণ এর তেমন কোনও শারীরিক লক্ষণ দৃশ্যমান হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘটনাচক্রে অন্য কোনও অসুখের জন্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে আলট্রা-সোনোগ্রাফিতে উঠে আসে ফ্যাটি লিভারের সমস্যা। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইনসিডেন্টাল ফাইন্ডিং হিসাবেই ফ্যাটি লিভারের সমস্যাটা ডাক্তারের কাছে আসে। তবে কিছু ক্ষেত্রে লিভার কোষে চর্বি জমা হওয়ার ফলে অনেক সময় হালকা পেট ব্যথা হয়। কিন্তু সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য শুধুমাত্র এই ব্যথা যথেষ্ট নয়। তবে যাদের প্রাথমিক লক্ষণগুলি অর্থাৎ উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হাইট্রাইগ্লিসারিড ও সেন্ট্রাল ওবেসিটি রয়েছে তাঁদের সাবধানতা অবলম্বনের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে স্ক্রিনিং করাতে পারেন।
৪. কী ধরনের পরীক্ষায় ফ্যাটি লিভার ধরা পড়ে?
সাধারণত আলট্রা সোনোগ্রাফিতে প্রাথমিক পর্বের স্ক্রিনিং টেস্ট হিসাবে গণ্য করা হয়। ফ্রাইব্রো স্ক্যান করে নিলে লিভারের কোষে কী পরিমাণ চর্বি জমেছে এবং তার ফলে লিভারের কোষগুলোতে কতটা ফাইব্রোসিস হয়েছে সেটা সম্বন্ধে ভালোরকমের ধারণা করা সম্ভব। যাদের পেটে অত্যাধিক মেদ বা ভুঁড়ি আছে তারা এআরএফআই (ARFI) করে নিতে পারেন। তবে, আরও নিশ্চিত হতে এমআরআই স্ক্যান করা হয়। ক্ষতির সঠিক অনুমান করতে লিভার বায়োপ্সি সেরা উপায়। কিন্তু যেহেতু এই পরীক্ষা বেশ ঝুঁকিপ্রদ, তাই লিভার বায়োপ্সি করার কথা কোনও চিকিৎসক প্রথমেই ভাবেন না। যদিও সাধারণ রক্তপরীক্ষায় এই সমস্যা বোঝা সম্ভব নয়, তবে ন্যাশ থাকলে লিভার ফাংশন ব্লাড টেস্ট করলে লিভারের অসংগতি উঠে আসে।
৫. আচ্ছা, এই সমস্যা কি বংশানুক্রমিক?
এভাবে জোর দিয়ে বলা সম্ভব নয় ফ্যাটি লিভারের অসুখ বংশপরম্পরায় হতে পারে। তবে, ব্লাড সুগার, উচ্চরক্তচাপ এবং হাইট্রাইগ্লিসারিডের সমস্যা যদি বাংশপরম্পরায় চলতে থাকে, তাহলে ফ্যাটি লিভারের রোগে হেরিডিটির ক্ষীণ সংযোগকে অস্বীকার করা যায় না।
৬. লিভারের এই সমস্যা কি শুধু পুরুষদেরই হয়?
একেবারেই ভুল ধারণা! তথ্য অনুসারে দেখা গেছে ফ্যাটি লিভার একেবারেই শুধুমাত্র পুরুষদের সমস্যা নয়। নারী, পুরুষ উভয়েই এতে আক্রান্ত হতে পারে। আক্রান্তের সংখ্যায় মহিলারাই সম্ভবত সংখ্যাগুরু। পশ্চিমের দেশগুলির মতো আমাদের মতো দেশগুলিতে মহিলাদের মধ্যে মদ্যপানের প্রচলন নেই বা খুবই কম। তবুও অন্যান্য কারণগুলির জন্যই মহিলারা নন-অ্যাকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বা ভয়ানক ন্যাশে আক্রান্ত হচ্ছেন।
৭. ন্যাশের চিকিৎসা তবে কি লিভার টনিক?
একেবারেই না। বাজার চলতি লিভার টনিক কখনওই ভরসাযোগ্য নয়। ওভার-দি-কাউন্টার এই সব ড্রাগ থেকে উলটে ক্ষতি হতে পারে। তাই ফ্যাটি লিভার বা ন্যাশের প্রাথমিক চিকিৎসা হচ্ছে লাইফস্টাইল বদলে ফেলা। জীবনশৈলীতে আক্ষরিক অর্থে বদল আনা জরুরী। ওজন কমানো, ডায়াবেটিস, ট্রাইগ্লিসারিড, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণই সেরা উপায়। সেরে উঠতে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনেকে ব্যরিয়াট্রিক সার্জারি করান। সেন্ট্রাল ওবেসিটি কমাতে এবং ওজনের সঙ্গে উচ্চতার ভারসাম্য আনতে, তা করা যেতেই পারে। ভিটামিন-ই ওষুধ হিসাবে দেওয়া হয় যদিও তার কার্যকারিতা নিয়ে সঠিক তথ্য এখনও সেরকমভাবে পাওয়া যায়নি। যাদের ইনসুলিন রেসিসটেন্স আছে তারা ইনসুলিন সেন্সিটাইজার খেলে উপকার পেতে পারেন। এর বাইরে বাকি সবটাই রোগীকে খেয়ালে রাখতে হবে— খাদ্যাভ্যাস থেকে জীবনশৈলীতে স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য বজায় রাখার প্রধান দায়িত্ব কিন্তু তাঁরই।
৮. অনেকে বলেন কফি পান করলে লিভার ভালো থাকে?
অনেক বলেন বটে, যে নিয়মিত কফি পান করলে ফাইব্রোসিস কমে। তবে এর কোনও বিজ্ঞানসম্মত ব্যাথ্যা নেই। নেই কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারণও। তাই, সব ভুলে শুধু কফি পান করতে লেগে যাওয়ার মানে নেই। বরং, আদর্শ জীবনশৈলীতে আর চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে বেশি উপকৃত হবেন।
অনুলিখন: নিজস্ব প্রতিনিধি

No Comments to “ফ্যাটি লিভার থেকে বাঁচতে”

Comments are closed.