বাংলাদেশে চিকিৎসা সেবায় সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব



  • Add Comments
  • Print
  • Add to Favorites

বর্তমান সরকারের আমলে সাস্থ্য এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নয়ন চোখে পড়ার মতন ৷ সম্প্রতি বাংলাদেশে বিশ্বমানের সাস্থ্য সেবা প্রদানের লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কতোগুলো প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষনা দিয়েছেন ৷ এবং তিনি বলেছেন “অসুস্থ হলে আমাকে বিদেশে নিবেন না ৷ আমি দেশের মাটিতেই চিকিৎসা নেব ৷” যা সত্যই আমাদের জন্য গর্বের ৷ প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশ থেকে বিরাট অংকের মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে ৷ পাওয়া তথ্যমতে প্রতি বছরে প্রায় আড়াই লক্ষ্য মানুষ বিদেশে যাচ্ছে চিকিৎসার জন্য ৷ বেশির ভাগ যাচ্ছে ভারত, থাইল্যান্ড ও সিংঙ্গাপুরে ৷ এর জন্য প্রতি বছর বাংলাদেশর হাতছাড়া হচ্ছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ৷ যা আমাদের মতো একটা উন্নয়নশীল দেশের জন্য সত্যই আতংকের ৷ এর মূল কারনগুলো হলো:
১. বাংলাদেশর চিকিৎসার প্রতি জনগনের সচেতনতা এবং আস্থার অভাব ৷
২. কিছু কিছু ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল, অবকাঠামোগত অবস্থা এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকা ৷
৩. দেশের জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসকদের পরিমাণ কম থাকায় মানসম্মত চিকিৎসা প্রদানে ব্যার্থ হওয়া ৷
৪. কিছু দালাল চক্রের প্ররোচনা ৷
৫. বিত্তবানদের সহজাত অভ্যাসে পরিনত হওয়া ৷
৬. চিকিৎসার ব্যাপারে সঠিক তথ্যের / হাসপাতাল কতৃপক্ষের সঠিক গাইডের অভাব ৷
এগুলো হচ্ছে সাধারন কারন যা বেশিরভাগ মানুষের জানা ৷ তবে মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজনও যে ঠেকায় পড়ে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যায়, তার এক বাস্তব ঘটনা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি ৷ আমার বিশ্বাস এতে রোগীদের চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার কারন সমূহের সাথে আরো একটি যোগ হবে ৷

আমার ভাগ্নে ফেরদাউস আহিদ(২১) ২৭ নভেম্বর, ২০১৪ টুঙ্গিপাড়া বাইপাস সড়কে বাইক এক্সিডেন্ট করে ৷ স্থানীয় লোকজন তাকে অজ্ঞান অবস্থায় টুঙ্গিপাড়া সাস্থ্য কমপ্লেক্স এ নিয়ে আসে ৷ সেখান থেকে রেফার করা হয় শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজে (গোপালগঞ্জ) ৷ চিকিৎসা শুরু হলো ৷ হাসপাতলে ভর্তির প্রায় ৩০ ঘন্টা পরে আমার বোন (রোগীর অ্যাটেনডেন্ট) আবিষ্কার করলো যে, রোগীর বাম হাতে পালস পাওয়া যাচ্ছে না ৷ আমাকে ফোন করে বলল ৷ আমি দ্রুত ডাক্তার ডাকতে বললাম ৷ ডাক্তার এসে দেখে রোগীকে নিটোর এ রেফার করলো ৷ নিটোর এ এমার্জেন্সি বিভাগ এর ডাক্তার রোগীকে দেখলেন ৷ বাইক এক্সিডেন্ট এ ব্রাকিয়াল প্লেক্সাস ইনজুরি, একই হাতের সাবক্লেভিয়ান আর্টারি ব্লক(NICVD থেকে করা ডায়াগনোসিস) আর বাম টিবিয়া ফিবুলা ভাঙ্গা ৷ নিটোর থেকে রেফার করা হলো ন্যাশনাল ইন্সিটিউট অব কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজেস (NICVD) তে ৷ সৌভাগ্যক্রমে পাশের ছোট আর্টারি দিয়ে অল্প সার্কুলেশন থাকায় হাতটি ভালো ছিল ৷ NICVD থেকে বাইপাস করতে চাইলো, রাজি হলাম না ৷ একই জায়গায় সম্প্রতি বড় সার্জারি থাকলে পরে নার্ভ রিপেয়ার সার্জারিতে সমস্যা হবে কি না তা নার্ভ সার্জনদের কাছে শুনে নেওয়ার জন্য সময় চেয়ে নিলাম ৷ হাতে স্টেন্ট করানোর বিঞ্জাপন দেখে গেলাম ইব্ন সিনা হাসপাতালে ৷ ওখানে এক ডাক্তার সচরাচর স্টেন্ট করে থাকেন ৷ উনি রোগীর সিটি এনজিওগ্রাম দেখে এতো বড় স্টেন্ট করার সাহস করলেন না ৷ বললেন, ব্লকটা বেশি লম্বা যায়গা জুড়ে হওয়ায় স্টেন্ট আনসাকসেসফুল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ৷ আপনারা নার্ভ সার্জারি আগে করেন ৷ NICVD থেকে রেফার করা হলো হলোন্যাশনাল ইন্সিটিউট অব নিউরোসায়েন্স (NINS) হাসপাতালে ৷ সেখানের আউটডোর থেকে বলা হলো, আমরা ব্রেনের চিকিৎসা করি, পেরিফেরাল নার্ভাস সিস্টেমের চিকিৎসা করি না ৷ NINS থেকে রেফার করা হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতলে ৷ সেখানে নিউরো সার্জারি ডিপার্টমেন্ট এ ভর্তি করা হলো ডাঃ জিল্লুর রহমান এর অধীনে ৷ ডাঃ জিল্লুর রহমান বললেন, রোগীর হাত কেটে ফেলেন, চিকিৎসা করে কোন লাভ হবে না ৷ ওখানে ভর্তি থাকা অবস্থায় ৭ দিন পর অর্থোপেডিক ডিপার্টমেন্ট থেকে অনেক ঘোরাঘুরির পর ব্যান্ডেজ করা হলো পায়ে ৷ সন্ধ্যায় আমি রোগিকে দেখতে গিয়ে দেখলাম POP ব্যান্ডেজ ভাঙ্গা এবং পায়ের নিচের অংশ দুলছে প্রায় ৷ দেরি না করে ওখান থেকে রিলিজ নিয়ে পান্থপথের একটা প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে সার্জারি করিয়ে ইন্টারনাল ফিক্সেটর লাগিয়ে নিলাম ঐ রাতেই ৷ এক্সিডেন্টের ২১তম দিন ছিল সেদিন ৷ প্রায় তিন মাস পার হলো ৷ রোগী তখন হাটতে পারে ৷ এবার খুজতে শুরু করলাম নার্ভ সার্জনদের ৷ দেশের হাতে গোনা ৫ জন নার্ভ সার্জন সবাইকেই দেখিয়েছি ৷ কেউ ই রাজি হয়নি সার্জারি করতে ৷ শেষে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ডাক্তার তাঁর প্রাইভেট চেম্বারে বললেন খোলামেলা কথা ৷ এতো বড় ইনজুরি আমি একা সার্জারি করার সাহস পাই না ৷ বরং আপনারা বিএসএমএমইউ তে ভর্তি হন ৷ আমাদের হ্যান্ড এন্ড মাইক্রো সার্জারি ডিপার্টমেন্ট এ আরো দুজন নার্ভ সার্জন আছেন ৷ আমরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেব ওর জন্য কোনটা ভালো, আর আমরা তাই ই করবো ৷ শুনে খুশি হলাম ৷ তারিখ মতো গেলাম আউটডোর এ ৷ আউটডোরে সাংঘাতিক ভীড়, পিয়ন রোগীদের চাপ সামলাতে ব্যার্থ প্রায় ৷ দুর্ভাগ্যবশত ওই ডাক্তার ওই দিন আউটডোর এ ছিলেন না ৷ যিনি ছিলেন তিনি রোগীকে দেখলেন ৷ ওনার যত্নহীন এসেসমেন্ট এ রোগী ব্যাথায় চিল্লালো ৷ আমাদের এমআরআই, সিটি এনজিওগ্রাম এবং এক্সরে করাই ছিলো ৷ আমরা ফ্লিল্ম সহ রিপোর্ট নিয়ে গিয়েছিলাম ৷ ডাক্তার আবার ওই টেস্ট গুলো দিলেন ৷ আমরা বললাম এগুলো তো করা আছে ৷ ডাক্তার বললেন “তাহলে আর করতে হবে না, আগামী সাপ্তাহে আসেন ” ৷ পরের সপ্তাহে বললেন, “চেস্টা করলে কিছু উন্নতি হবে, কিন্ত এখানে আমরা জরুরি রোগীর চিকিৎসা ই করে পারি না ৷ আপনার এই সার্জারি কখন করবো ৷ এটা বড় সার্জারি, শুরু করলে সারাদিন পার হয়ে যাবে ৷ আপনি প্রতি সপ্তাহে আসতে থাকেন, যদি কখনো রোগীর চাপ কম থাকে তাহলে ভর্তি করে নেব ৷” পরপর তিন সপ্তাহ গেলাম ৷ চাপ আর কমলো না, এবং কমার কোন সম্ভাবনাও দেখলাম না ৷ হতাশ হলাম ৷
আত্মীয়স্বজনদের কথায় চিন্তা আসলো ইন্ডিয়া চিকিৎসা করানোর ৷ বিএসএমএমইউ ‘র সেই ডাক্তার বেশ প্রশংসা করলেন গঙ্গা হাসপাতালের (তামিলনাড়ু, ইন্ডিয়া) ৷ ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় রেফার টাও তিনিই করলেন ৷ আসলে একটা মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশের আমার চেনা মোট ৫ জন হ্যান্ড অ্যান্ড মাইক্রো সার্জন ডাক্তার সবাই ওই হাসপাতাল থেকেই ট্রেনিং প্রাপ্ত ৷
ইন্ডিয়া তে পৌছালাম ৷ চিকিৎসাও শুরু হলো ৷ তবে গঙ্গা হাসপাতালে নয়, সিএমসি হাসপাতলে ৷ রোগীর ফাইল দেখে ডাক্তার আর নার্স রা শুধু একটা প্রশ্নই বার বার করে, “আপনারা এতো হাসপাতাল চেঞ্জ করছেন কেন?” আমি একটা উত্তর ই বারবার করেছি, “রোগী এক্সিডেন্ট করেছে মফস্বল এলাকায়, কাছাকাছি কোন টারসিয়ারী লেভেলের হাসপাতাল ছিল না” ৷ তবে এক ডাক্তার বলেছিলেন, “হাসপাতাল গুলোর মধ্যে ৩টা তো আপনাদের ন্যাশনাল ইন্সিটিউট ৷ আর ঢাকা মেডিকেল কলেজ তো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ৷ ঢাকা তো আপনাদের ক্যাপিটাল সিটি ৷” আমি আর কোন উত্তর করলাম না, শুধু মনে মনে বললাম “You are right Dr. Samuel Raj” ৷

ঘটনার পর্যালোচনার দায়িত্বভার পাঠকদের হাতেই ছেড়ে দিলাম ৷ শুধু বলতে চাই রেফারেল বিভ্রাটের কথা ৷ গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ থেকে হাতে ব্লাড সার্কুলেশন না পাওয়ার জন্য কেন নিটোরে রেফার করা হলো? কেন সরাসরি NICVD তে রেফার করা হলো না? এর জন্য রোগীর বাড়তি ১০ ঘন্টা সময় বেশি কেন নষ্ট হলো? সার্কুলেশন ২৪ ঘন্টা বা তার বেশি বন্ধ থাকলে লিম্ব ড্যামেজ হয় সে বিবেচনাটা কি তাদের করা উচিত ছিল না?
আর নার্ভ ইনজুরির চিকিৎসা কোথায় পাবো তার কোন সঠিক উত্তর আমাকে কোন হাসপাতাল/ডাক্তার দিতে পারেন নাই ৷ সবাই বলছে নিউরো সার্জনদের দেখাতে ৷ রেফারেল ইতিহাসও তাই বলে ৷ পরে ঘুরতে ঘুরতে আর নেট ইনফরমেশন নিয়ে জানতে পারলাম আসলে স্পেশালাইজড অর্থোপেডিক ডিপার্টমেন্ট “হ্যান্ড অ্যান্ড মাইক্রো সার্জারি ” এর ডাক্তার রা হাতের নার্ভ সার্জারি করেন ৷

 

শেখ মুমিনুল্লাহ
আইএইচটি(ডিইউ)




No Comments to “বাংলাদেশে চিকিৎসা সেবায় সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব”

Comments are closed.