ব্যাথার জন্য সার্জারি নয়, ফিজিওথেরাপি ই সেরা চিকিৎসা !

0
13
Print

ডা: সাইফুল ইসলামঃ
ব্যাস্ত পাঠক, সম্ভব হলে পড়ে নিবেন ।
কাজে লাগতে পারে। রহিম সাহেব (ছদ্ম নাম) কোমর ব্যথা নিয়ে ভিশন ফিজিওথেরাপি সেন্টারে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার জন্য আসলেন । এসেই চিকিৎসক হিসেবে আমাকে পেলেন। আমি যথারিতি দেখা শুরু করলাম । রহিম সাহেব সিরিয়াস কোমর ব্যথার রোগী, নড়া চড়া করতেই ব্যথায় মুখ ভারি হয়ে যায়। বয়সের কারনে লজ্জায় হয়তো কান্না কাটি করেন না, কম বয়স হলে হয়তো কান্নাই করতেন। যাই হোক উনার মুখ দেখে বুঝতে পারছি , উনার ব্যথা সিরিয়াস । এছাড়া কোমর একদিকে বেঁকে গেছে।
রহিম সাহেব এই বাঁকা কোমর সোজা হওয়ার আশায় অনেক চিকিৎসককে দেখিয়েছেন, সবাই উনাকে অপারেশনের কথা বলে। উনি সবার মুখের উপর না বলে দিয়েছেন। এলোপ্যাথি হোমিওপ্যাথি সব প্যাথি শেষ করে অতি ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর পরামর্শে ফিজিওথেরাপিস্টের শরনাপন্ন হলেন। আমার সামনে বসেই বললেন, আপনারা কি অপারেশন ছাড়া PLID ভাল করতে পারেন ? আমি সাথে সাথে উনার কিছু রেড ফ্লাগ চেক করেই, এক বাক্যে বলে দিলাম হ্যাঁ । কারণ উনাকে ঘুরিয়ে পেচিয়ে সত্য বললেও লাভ নেই, উনি বরং কনফিউজড হয়ে এবার খনকার বাঁ কবিরাজের কাছে চলে যেতে পারেন। কারণ এই ধরনের রোগী গুলো অহরহ এমনই করে!
এবার রহিম সাহবে বলে বসলেন আপনারা কি কি থেরাপি দেন। আমি বললাম, এইভাবে বলবেন না। এটা দোকান না। আমি আপনাকে এসেস করব, আপনার কি কি সমস্যা সব বের করব, তারপর ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পরিকল্পনা করব। উনি কিছুটা আশ্বস্ত হলেন। এবার উনাকে সুচিকিৎসার জন্য ৪০-৪৫ মিনিট ধরে এসেস করলাম, কিছুটা চিকিৎসা দিলাম । উনি মুখে সন্তোষজনক কিছু না বললে, উনার মুখ দেখে বুঝে নিলাম ব্যথার তীব্রতা কমছে। আকাশের মুখ যেমন বুঝে নিতে হয় বৃষ্টির খবর, তেমনি কিছু কিছু রোগীর চেহারা দেখে বুঝে নিতে হয়। উনারা কিছু বলে না, জিজ্ঞাসা করলে বলে এই এই তো আছে, আছে আগের মত। চেহারা দেখেই আমাদের বুঝে নিতে হয় ।
চিকিৎসা এবং এসেস শেষে এবার রহিম সাহেব আমার কাছে চার্জ জানতে চাইলেন, যদিও সেটা রিসিপশনকে জিজ্ঞাসা করার কথা, আমার বয়স কম কিংবা অন্য কারনে অনেকেই আমাকে ছোট ডাঃ ভাবে, তবে শুধু এই চার্জ না, অহরহ অনেক বিষয় জানতে চায়, যেইগুলো আমাকে জিজ্ঞাসা করলেও পারে। তবে আমি মাইন্ড করি না, নিসংকোচেই চার্জ বলে দেই ১০০০ টাকা। অনেকে ফিজিওথেরাপিকে ৩০০/৪০০টাকা ভাবে । তাই এই চার্জ শুনে অবাক হয়। যদিও একজন ভাল কোয়ালিফাইড ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের চার্জ এর কমে সম্ভব না, উন্নত দেশে এক সেশন ফিজিওথেরাপি চার্জ বাংলাদেশি টাকায় ৭/৮ হাজার টাকার কম না । চিকিৎসা যেমন মানও তেমন । যদিও সব টাকা হেলথ ইনন্সুরেন্স থেকে আসে কিংবা সরকার দেয় । তাই মানুষের কষ্ঠ হয় না । কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট আলাদা । তাই কেউ সমস্যার কথা বললেই আমি নিজেই কমিয়ে দেই , অনেক ক্ষেত্রে নেই না । পরবর্তী ফিজিওথেরাপি চার্জের ক্ষেত্রে প্যাকেজ করে দেই । যাদের সাম্যর্থ নেই, তাদের ক্ষেত্রে কম রাখি । অর্থাৎ টাকার জন্য কাউকে কখনও ফেরত দেই নাই, দেবও না ! যদি সে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হয় ।
ওইদিনের বিষয় আলাদা ছিল, রহিম সাহেব এসেই বলেন এই দেশের চিকিৎসা উনার পছন্দ না । বিরাট বড়লোক বুঝিয়ে দিলেন । আমি বুঝে নিলাম টাকা পয়সা ব্যাপার না, টকা পয়সা উনার কাছে তেজপাতা । আমিও সহজেই বলে দিলাম ১ হাজার টাকা । উনি আকাশ থেকে পরলেন । এত চার্জ!!! আমি তো জানি ফিজিওথেরাপি ২০০/৩০০ টাকা!
মনে মনে কই মিয়া ৪৫ মিনিট ধরে দেখলাম, তখন ভাল লাগছে আর এখন টাকা দেওনের বেলায় আকাশ থেকে পড় । তোমারে এক হাজারই দেওন লাগবে, যতই আকাশ থেকে পড়, আর বাতাস থেকে পড় !
যাই হোক মাছ বাজারে মত অনেক দরকষাকষি করে , উনার কোন সমস্যা ছাড়াই টাকা কম দিলেন । শেষতক মহান আল্লাহর পাকের মর্জিতে উনি আমাদের এখানে ২ সপ্তাহ চিকিৎসা নিলেন । ২ সপ্তাহ পর অনেকটাই ভাল, যদিও মুখে বলে না , আমি চেহারা দেখে বুঝে নেই উনি ভাল হচ্ছেন; কিন্তু পুরোপুরি না । আগে ২ মিনিট হাঁটলেই পায়ে ব্যথা শুরু হত, এখন এক দেড় ঘন্টা হাটলে কোমরে ব্যথা হয় । বিছানা থেকে নড়াচড়া করতে গেলে যেই ব্যথা হত, সেটা আর হয় না । যাই হোক উনি খুব ব্যস্ত মানুষ, তবে মাঝে মাঝে আসেন, তবে হাসি মুখেই আসেন এখন । ব্যথার কথা জিজ্ঞাসা করলে মুখ ভার করে পেলেন।
তারপর কয়েকমাস আর দেখা নাই। একবার ফোন দিয়ে বললেন ডাঃ আমি কবে পুরোপুরি ভাল হব । আমি বললাম আপনি তো ভালই আছেন, এইভাবে ভাল থাকার চেষ্টা করেন ।
হঠাৎ অন্য আরেকদিন ফোন দিয়ে বলল, ডাঃ আমার অবস্থা খারাপ ! এক মিনিটও হাটতে পারি না । এবার আমি আকাশ থেকে পড়লাম। ঘটনা জানার চেষ্টা করলাম, রহিম সাহেব বিদেশ থেকে অপারেশন করে আসছেন । তেমন সমস্যা ছিল না, হালকা ব্যথা ছিল কোমরে, ভাল চেকআপের জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন । ওখানকার চিকিৎসকের পরামর্শে অপারেশন করিয়েছেন । সম্পূর্ন ভাল হওয়ার আশায় রহিম সাহেব অপারেশন করালেন । হিতে বিপরীত, উনাকে আবার অপারেশনের পরামর্শ দিলেন । উনি এবার মুখের উপর না দিলেন, বাংলাদেশী চিকিৎসকদের যেমন আগে বলেছিলেন।
আবার চিকিৎসা শুরু করলাম, এই আরেক যুদ্ধ, এবার তিনমাস দেখলাম । অনেকটা আগের অবস্থায় আসছে, তবে এখনও অপারেশনের পূর্বের অবস্থায় ফিরতে পারেন নাই।
ঠিক গতকালও একই রকম আরেক ঘটনার সম্মুখিন হলাম, ভিশন ফিজিওথেরাপি সেন্টারের আউটডোর ফিজিওথেরাপি ইনচার্জ ডাঃ আনিস সাহেবের রোগি, মোটামুটি ভালই ছিল, হঠাৎ করে প্রতিবেশী দেশ থেকে অপারেশন করে আসছেন । এখন অবস্থা আগের চেয়ে অনেক অনেক খারাপ । মুখের উপর বলতে ইচ্ছে করল, না। কিন্তু বলা হয় না, আসলে মানুষ অসুস্থ হলে খুব দিশেহারা হয়ে যায়, কি করবে কি করবে না, সব ভুলে যায়, যে যাই বলে তাই করে। না খুবই কমই বলে।
সবাই ভাল থাকবেন, কোমর ব্যথা সিরিয়াস হলে অবশ্যই একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন । সুস্থ থাকেন, ভাল থাকেন ।
ধন্যবাদ
ডাঃ সাইফুল ইসলাম, পিটি
কো-অর্ডিনেটর, ভিশন ফিজিওথেরাপি সেন্টার , উত্তরা, ঢাকা ।