ভেলরি টেইলর বাংলাদেশের অন্যরকম বন্ধু



  • Add Comments
  • Print
  • Add to Favorites

বাংলাদেশে পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র ‘সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড’ (সিআরপি)-এর পরিকল্পক ও প্রতিষ্ঠাতা ভেলরি টেইলর বলেছেন, আজকের সিআরপি হঠাৎ করেই এত বড় প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়নি। আমার স্বপ্ন, আগ্রহ ও একাগ্রতার ফলে সিআরপি এ পর্যায়ে এসেছে। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশের মানুষ সিআরপি থেকে বহুমুখী সেবা পাচ্ছে। তিনি বলেন, সিআরপি যাতে নিজস্ব অবয়ব ও স্বকীয়তা নিয়ে টিকে থাকে সেদিকে সচেতনতার সঙ্গে খেয়াল রাখা এ দেশবাসীর কর্তব্য। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের মাদার তেরেসা-খ্যাত এই মহীয়সী নারী এ মন্তব্য করেন। ফিজিওথেরাপির স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সিআরপির প্রতিষ্ঠাতা ভেলরি টেইলর বলেন, আমাদের প্রাণের এই প্রতিষ্ঠানটি আজ একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠেছে। এর সেবা ও মান টিকে থাকবে এই আমাদের প্রত্যাশা। সিআরপির মাধ্যমে বাংলাদেশের পঙ্গু ও পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসনে, দুস্থ, দুর্গত মানুষের সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৫ সালে ব্রিটিশ সরকার এই ব্রিটিশ নারীকে ‘অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ অ্যাম্পায়ার’ পদকে ভূষিত করে। ১৯৯৬ সালে তিনি ‘আর্থার আয়ার’ সোনার পদক লাভ করেন। স্বাস্থ্যসেবায় অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করেন। ২০০৪ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক স্বীকৃতি হিসেবে স্বাধীনতা পদক দেওয়া হয় তাকে। ১৯৪৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যের ব্রুসলিতে জন্ম নেওয়া ৭২ বছর বয়সী ভেলরি কর্মজীবনে লাভ করেছেন অনেক স্বীকৃতিসহ সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি। স্বেচ্ছাসেবা এবং সম্পূর্ণ আপন প্রচেষ্টায় সিআরপি প্রতিষ্ঠা করে তিনি বিশ্বে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন কারণে পঙ্গুত্বের শিকার হাজার হাজার মানুষকে স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফিরিয়ে আনতে তার গড়া সিআরপি নজিরবিহীন ভূমিকা পালন করছে। চিরকুমারী ভেলরির জন্ম ব্রিটেনে হলেও তার সব কিছুই যেন বাংলাদেশ। মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে জীবনের বাকি সময়টা থেকে যান এই বাংলাদেশেই। প্রতিবন্ধী, পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের কল্যাণে প্রতিষ্ঠা করেছেন হাসপাতাল, পুনর্বাসন কেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। রাজধানীর অদূরে সাভারের চাপাইন এলাকায় প্রতিষ্ঠিত তার সিআরপি বাংলাদেশে সেবার এক মহত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে তৈরি করেছেন চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও পরামর্শ কেন্দ্র। বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে রেখেছেন অগ্রণী ভূমিকা। তিনি নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করে অসহায় মানুষের সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায়— জানত না এ দেশের মানুষ। তিনি প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে মানুষকে বুঝিয়েছেন ফিজিওথেরাপির কথা। এক পর্যায়ে ১৯৭৯ সালের ১১ ডিসেম্বর এই মহীয়সী নারী সোহরাওয়ার্দী হাসাপাতালের একটি পরিত্যক্ত গোডাউনে মাত্র চারজন রোগী নিয়ে সিআরপির কাজ শুরু করেন। এরপর বিভিন্ন চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে ১৯৯০ সালে সাভারে ১৪ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠা করেন সিআরপির প্রধান কার্যালয়। ক্রমান্বয়ে সিআরপির কলেবর বেড়ে রাজধানীর মিরপুর, সাভারের সিআরপি ও আশুলিয়ার গণকবাড়ী, মানিকগঞ্জ ও পুরান ঢাকায় একটি পাইলট প্রজেক্টসহ ৮টি জেলার ৬১টি উপজেলায় সিআরপির সমাজভিত্তিক পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু রয়েছে। সর্বস্তরের স্থানীয় প্রতিবন্ধীদের সহযোগিতার লক্ষ্যে সমাজসেবা অধিদফতরের সহযোগিতায় ১৩ জেলায় ১১৫টি উপজেলায় কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। মিস ভেলরি টেইলরের অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ-তিতিক্ষার ফসল সিআরপি আজ এক পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান। মানব সেবার এক বিশেষ মাইলফলক সিআরপি। সমাজের অগণিত প্রতিবন্ধী ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের জীবন সাজাতে নিবিড়ভাবে কাজ করে চলেছে দুঃখী মানুষের এই প্রতিষ্ঠানটি। সিআরপির রয়েছে এক বিশাল দেশি-বিদেশি কর্মীবাহিনী, তাদের মেধা, শ্রম ও আন্তরিকতার ফলে প্রতিদিন সুস্থ হয়ে নিজ ঘরে ফিরছেন মানুষ। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য, পুনর্বাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও বাহ্যিক পরিবেশ ফিরিয়ে দিতে নিরন্তর কাজ করে চলেছে এই প্রতিষ্ঠান। সাভারে সিআরপির প্রধান কার্যালয়ে প্রতি মাসে গড়ে পাঁচ হাজার রোগী ফিজিওথেরাপি এবং এক হাজার রোগী অকুপেশনাল থেরাপি চিকিৎসা নিয়ে থাকে। মেরুদণ্ডে আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের জন্য রয়েছে ১০০ শয্যার একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য রয়েছে একটি শিশু ইউনিট। প্রতিবন্ধী শিশুর দৈনন্দিন জীবনযাপন ও কর্মকাণ্ডের সহায়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয় এখানে। আছে একটি স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি ইউনিট। বিভিন্ন প্রকার স্নায়ুবিক সমস্যা স্ট্রোক, মস্তিষ্কের আঘাত, প্যারালাইসিস ও ব্যথার জন্য এখানে রয়েছে বিশ্বমানের ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি। এখানে শেখানো হয় কম্পিউটার, ইলেট্রনিক্স মেরামত, টেইলারিং, এমব্রয়ডারি, সপ ম্যানেজমেন্ট, নার্সারি, পোলট্রি ও সেলুনের কাজসহ নানা কিছু। লেখাপড়ার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে স্পেশাল নিডস স্কুল। সিআরপির রোগীদের চিকিৎসাসেবা, পুনর্বাসনেযে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় তার বেশির ভাগই আসে বৈদেশিক সাহায্য থেকে। তবে রোগীদের আর্থিক অবস্থা বুঝে আনুপাতিক হারে চিকিৎসার জন্য অর্থ নেওয়া হয়। মিস ভেলরি টেইলরের বৈদেশিক যোগাযোগের কারণে সিআরপির ফান্ড পেতে তেমন অসুবিধা হয় না। দেশি-বিদেশি নানা সংস্থা, ব্যক্তি প্রতি বছর এই প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন। সেসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সহযোগিতায় দীর্ঘদিন থেকে নিরবচ্ছিন্ন সেবা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে ভেলরির প্রতিষ্ঠান সিআরপি।




Tags:

No Comments to “ভেলরি টেইলর বাংলাদেশের অন্যরকম বন্ধু”

Comments are closed.