মহিলা ও পুরুষের মস্তিষ্কে কি কোনও পার্থক্য আছে ?

0
15
Print

প্রখ্যাত ভারতীয় স্নায়ু চিকিৎসাকেন্দ্র নিমহ্যানস থেকে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
ওই হাসপাতালে মাথায় আঘাত নিয়ে ভর্তি হওয়া মানুষদের উপর এক সমীক্ষা চালানো হয়। প্রায় দেড় হাজার রোগীর ওপর চলে সমীক্ষা। এই পর্যবেক্ষণের ফলে দেখা যায়, রোগীর মধ্যে যাঁরা মহিলা তাঁদের আঘাতজনিত অক্ষমতা বেশি। বিভিন্ন ধরনের সমস্যার লক্ষণও বেশি। রোগীর সেরে উঠতেও দেরি হচ্ছে। এমনকী মাথায় চোট থেকে মৃত্যুর হারও বেশি পুরুষদের তুলনায়। আর এই সমস্ত তথ্য থেকেই উঠছে প্রশ্ন—
তবে কি আমাদের মস্তিষ্কে লিঙ্গপ্রভেদ আছে? প্রখ্যাত গবেষণাপত্র জার্নাল অব নিউরোসায়েন্স রিভিউ-এর একটি গোটা সংখ্যায় (জানুয়ারি/ফেব্রুয়ারি ২০১৭) এই বিষয়ে চর্চা হয়েছে।

পুরুষ এবং নারীর মস্তিষ্কের আকারে যে তফাত রয়েছে, সবার জানা।
পুরুষের মস্তিষ্কের আকার মহিলাদের তুলনায় ১০ শতাংশ বড়। তবে অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, যেহেতু পুরুষের দৈহিক গঠন মহিলাদের তুলনায় বড় হয়, তাই মস্তিষ্কের গঠনও সেই অনুপাতে বড়। গবেষণাধর্মী এমআরআই স্ক্যান করে দেখা গিয়েছে, ব্রেন-এর কিছু কিছু অংশ লিঙ্গবিভেদে সাইজে বড়— যেমন মানবদেহে কানের ওপরে মস্তিষ্কের মধ্যে আখরোটের মতো একটি ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ অংশ আছে। একে বলে অ্যামিগডালা। মজার ব্যাপার হল, ছেলেদের এই অংশটি মেয়েদের চেয়ে ১০ শতাংশ বড় আকারের হয়।

এটুকু দেখেই বিচার করলে চলবে না। আরও কিছু বিষয় রয়েছে। আমাদের মস্তিষ্কে দু’রকমের অংশ আছে— প্রথমটি হল, স্নায়ুকোষ সমূহ (গ্রে ম্যাটার)। মস্তিষ্কের এই অংশ থেকে সমস্ত ধরনের কাজকর্মের পরিকল্পনা হয়। দ্বিতীয় অংশটি হল স্নায়ুজালিকা সমূহ (হোয়াইট ম্যাটার)। মস্তিষ্কের এই অংশের সাহায্যে দেহের অসংখ্য কোষ একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। ব্রেনের এই অংশকে সুইচ এবং অসংখ্য তারের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। এছাড়া মস্তিষ্কের ডান এবং বাম— এই দুটি গোলার্ধ রয়েছে। এই দুই প্রান্তের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করে চলেছে একটি চওড়া কেব্‌ল। একে বলে করপাস কালোসেম।

ভাষা শিক্ষা, গোনার ক্ষমতা, লেখাপড়া শেখার ক্ষেত্রে বাম গোলার্ধের বেশি ভূমিকা থাকে। অন্যদিকে চারুকলা, সঙ্গীত, কল্পনা প্রবণতা এইগুলি ডান গোলার্ধের কাজ। দেখা গিয়েছে পুরুষদের মস্তিষ্কে স্নায়ুকোষের সংখ্যা মহিলাদের চেয়ে সাতগুণ বেশি।
এইজন্য পুরুষরা কোনও সিদ্ধান্ত চটজলদি নিতে পারেন। মহিলাদের আবার স্নায়ুসংযোগকারী নার্ভ পুরুষদের তুলনায় দশগুণ বেশি।
তাই তাঁদের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং বাক্‌শক্তি অনেক বেশি থাকে। এই জন্যে যুক্তি-তর্কে মহিলাদের হারানো শক্ত।
এছাড়া মহিলাদের হিপ্পোক্যাম্পাস এবং লিমবিক লোব বড় হওয়ার কারণে স্মৃতিশক্তি পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি। ঠিক একই কারণে মহিলারা অনেক বেশি আবেগপ্রবণ!

এছাড়া সিংগুলেট জাইরাস অংশ বড় হওয়ার কারণে মহিলারা খুব দ্রুত এবং সঠিকভাবে স্মৃতি রোমন্থন করতে পারেন— যা সাধারণত পুরুষরা পারেন না।
তবে পুরুষদের মস্তিষ্কও বহু কাজে মেয়েদের চেয়ে বেশি দক্ষ। উদাহরণ হিসেবে গাণিতিক সংখ্যাতত্ত্ব, স্থাপত্যবিদ্যা, ক্রীড়াবিদ্যা এবং মাপজোকের কাজের কথা বলা যায়।

এও জানা গিয়েছে, পুরুষরা কাজকর্ম করার ক্ষেত্রে ডান অথবা বাম যে কোনও একটি মস্তিষ্কের উপরই নির্ভরশীল থাকেন (ডান অথবা বাম)। অন্যদিকে মহিলারা ব্রেনের দুটি অংশেরই সমানভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম। এই কারণে পুরুষদের তুলনায় মেয়েরা কাজকর্মে সঙ্গতি রেখে এগতে পারেন।
তবে কিছু স্ত্রী হর্মোন যেমন ইস্ট্রোজেনের প্রভাবে মেয়েরা অনেক বেশি আবেগপ্রবণ হন পুরুষদের তুলনায়। এই জন্যে মহিলাদের মধ্যে অবসাদে ভোগার প্রবণতা বেশি থাকে। অন্যদিকে পুরুষদের মধ্যে অটিজম, সিজোফ্রেনিয়ার মতো রোগ বেশি দেখা যায়। আবার ক্রনিক বা দীর্ঘদিনের ব্যথা যা অনেকটা মস্তিষ্কপ্রসূত— মেয়েদের বেশি হয়।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে শারীরিকভাবে পুরুষ এবং মহিলাদের মস্তিষ্কের গঠন এবং কাজের কিছু তফাত আছে। কিন্তু পরিশ্রম ও অভ্যাস দ্বারা এই পার্থক্য অনেকাংশেই ঢাকা দেওয়া যায়। আর এই কারণেই আমরা ‘বাকপটু’ পুরুষ বা ‘কার রেস’-এ মহিলা ড্রাইভার আকছার দেখতে পাই!