শিশুর অটিজমের লক্ষণ ও করণীয়



  • Add Comments
  • Print
  • Add to Favorites

ডাঃ মুজিবুল হক ::
অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার কি(Autism spectrum Disorder) :

অটিজম হল মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ জনিত অসুবিধা, যাকে সমন্বিত ভাবে ’ Autism Spectrum Disorder বা ASD বলা হয় ।

“Specturm” বলতে অটিজম থাকা শিশুর নানা লক্ষণ, দক্ষতা এবং প্রতিবন্ধকতার পর্যায় অথবা সীমাবদ্ধতার ব্যাপকতাকে বুঝায় যা একটি অটিজম শিশুর মাঝে থাকতে পারে। এটা স্বল্প মাত্রা থেকে গুরুতর মাত্রায় শিশুর মাঝে থাকতে পারে।

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার এর ধরণঃ-
 অটিজম ডিসঅর্ডার (ক্লাসিক অটিজম)
 এসপারজার ডিসঅর্ডার (এসপারজার সিন্ড্রোম)
 পারভেসিভ ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার নট আদার ওয়াইজ স্পেসিফাইড (PDD-NOS)
 রেটস্ ডিসঅর্ডার রেট সিন্ড্রোম
 চাইল্ডহুড ডিসইন্ট্রিগ্রেশন ডিসঅর্ডার (CDD)
অটিজম কাদের হয়?
যে কোন দেশের যেকোন সমাজের যে কোন শিশুর অটিজম হতে পারে। ছেলে শিশুদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা মেয়ে শিশুদের তুলনায় চারগুন বেশি ।

অটিজম কেন হয়?

অটিজম কেন হয় তার সঠিক কারণ এখনও জানা যায়নি। অটিস্টিক জনসংখ্যায় ৫ থেকে ১০ শতাংশের ক্ষেত্রে, অটিজম থাকার কারণস্বরূপ রোগজনিত ভিত্তি চিহ্নিত করা গেছে। বাকি ৯০ শতাংশের ক্ষেত্রে এই ধরনের কোন সঠিক কারণ এখনও চিহ্নিত করা যায় নাই। অটিজম প্রকাশের সঠিক কারণ জানা না গেলেও যতটুকু জানা গেছে তাতে বলা হয়েছে অটিজম জিন-এর জটিল কোন উপাদান এবং পরিবেশের পরিস্থিতির পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়াজাত সমস্যার কারনে অটিজম হয়। তবে মা-বাবার শিশু লালন-পালন করার কোন ত্র“টির কারণে অটিজম দেখা যায় এই ধারণা এখন বাতিল করা করা হয়েছে।

অটিজম এর লক্ষণ সমূহঃ
অটিজম এর লক্ষণ সমূহ একেক শিশুর ক্ষেত্রে একেক রকম হয়। কিন্তু সাধারণভাবে এদেরকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়।
 সামাজিক প্রতিবন্ধকতা
 যোগাযোগ স্থাপনে সমস্যা/প্রতিবন্ধকতা
 পুণরাবৃত্তিমূলক ও একই আচরণ বার বার করা (Repetitive and Stereotyped)

সামাজিক প্রতিবন্ধকতাঃ
অটিজম আছে এমন অধিকাংশ শিশুরা তাদের দৈনন্দিন সামাজিক যোগাযোগ স্থাপনে অসুবিধার সম্মুখীন হয়। অটিজম আছে এমন কিছু শিশুর লক্ষণ সমূহঃ-
 খুব সামান্য চোখে চোখ রাখে
 তাদের আশে পাশে উপস্থিত লোকদের কথা শুনতে আগ্রহ দেখায় না এবং অন্যদের কথার সাড়া দেয় না।
 তারা সহসা নিজেদের আনন্দ অন্যের সাথে ভাগ করতে পারেনা অথবা পছন্দের জিনিস আঙ্গুল দিয়ে দেখায় না।
 অন্যরা রাগ, দুঃখ বা স্নেহ প্রদর্শন করলেও কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় না বা নির্লিপ্ত থাকে।
 সাম্প্রতিক গবেষনায় দেখা যায় অটিজম আছে এমন শিশুরা সাধারণত সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত স্বাভাবিক সামাজিক আবেগীয় ইঙ্গিতগুলো বুঝতে পারেনা।
যোগাযোগের অসুবিধাঃ
 কাউকে কোন কিছু দেখানোর ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ অথবা খুব ধীরে ও দেরীতে এ কাজ করে।
 প্রথম বছরে শিশু সুলভ আওয়াজ বা শব্দ করলে ও পরবর্তীতে এটা করা বন্ধ হয়ে যাওয়া।
 দেরীতে ভাষা শেখে।
 একটি শব্দ বা বাক্যের অংশ বার বার বলে, প্রায় সময় তারা অর্থপূর্ণ বাক্য তৈরীতে ব্যর্থ হয়।
 একটি শব্দ বা বাক্য তারা শুনে, সেই শব্দ বা বাক্যকে তারা হুবহু বলে। একে ইকোলালিয়া (echolalia) বলে।
 অপরিচিত ও অপ্রাসঙ্গিক শব্দ ব্যবহার করে যা শুধুমাত্র এই শিশুদের সাথে সংশি¬ষ্টরাই বুঝতে পারে। এমন কি অটিজম আছে এমন শিশুরা যাদের মধ্যে ভাষার দক্ষতা ভাল তারাও প্রায় কথোপকথনে খেই হারিয়ে ফেলে।
পুনরাবৃত্তি মূলক আচরণ (Repetitive and Stereotyped Behaviors) :
 অটিজম আছে এমন শিশুদের প্রায়ই অস্বাভাবিক আচরণ এবং একই জিনিস বারবার করার প্রবণতা দেখা যায়। এই আচরণগুলো বারবার করাকে “স্টেরিওটাইপ”(ঝঃবৎবড়ঃুঢ়ব) আচরণ বলে।
 অটিজম আছে এমন শিশুদের মধ্যে অনেক সময় কোন একটি বিষয়ে অতি মাত্রায় আগ্রহ বা আসক্তি দেখা যায়। অটিজম থাকা শিশুরা চলমান কোন কিছু দেখে উত্তেজিত বা আকর্ষিত হতে পারে, যেমন চলন্ত গাড়ির চাকা।
 সমস্ত কিছুতে যেমন আছে তেমন দেখতে পাওয়ার প্রবণতা থাকে। কোন পরিবর্তন পছন্দ করে না।
 অঙ্গ প্রত্যঙ্গ অদভুত ভাবে ব্যবহার করে। যেমনঃ হতে ঝাপটা দেওয়া, আঙ্গুল নাড়ানো, মুখ বিকৃতি করা, পায়ের আঙ্গুলে ভর দিয়ে হাটা, দুলতে থাকা বা এপাশ ওপাশ শরীর নাড়ানো।
 সৃজনশীল বা কল্পনা নির্ভর খেলা করতে পারে না। অদ্ভূত জিনিস নিয়ে খেলতে ভালোবাসে। কোন কোন সময় তারা তাদের খেলনাগুলো কে নিয়ে যথাযথ ভাবেনা খেলে রেল গাড়ির মত একটার পেছনে আরেকটা লাইন কওে সাজাতে থাকে। এসময় কেউ একটা খেলনা সরিয়ে ফেললে সে খুব উত্তেজিত হয়ে যায়।
 অটিজম থাকা শিশুদের মধ্যে সংখ্যা, বিভিন্ন সংকেত ও বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়।
 অটিজম আছে এমন শিশুরা তাদের দৈনন্দিন জীবনের কার্যকলাপ নিয়ম মাফিক ভালভাবে করতে পারে, তবে অনেক ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। তারা একই খাবার খাওয়ার জন্য অথবা একই পথে স্কুলে যাওয়ার জন্য জেদ করতে পারে। দৈনন্দিন কার্যকলাপের সামান্যতম পরিবর্তন তাদের উত্তেজিত করতে পারে।
 নতুন পরিবেশ কিছ কিছু শিশুর মধ্যে চরম উত্তেজনা বা হতাশা দেখা দিতে পারে।
 অটিজম থাকা শিশুদের মধ্যে সংখ্যা, বিভিন্ন সংকেত ও বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়।
 অটিজম আছে এমন শিশুরা তাদের দৈনন্দিন জীবনের কার্যকলাপ নিয়ম মাফিক ভালভাবে করতে পারে, তবে অনেক ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। তারা একই খাবার খাওয়ার জন্য অথবা একই পথে স্কুলে যাওয়ার জন্য জেদ করতে পারে। দৈনন্দিন কার্যকলাপের সামান্যতম পরিবর্তন তাদের উত্তেজিত করতে পারে।
 নতুন পরিবেশ কিছু কিছু শিশুর মধ্যে চরম উত্তেজনা বা হতাশা দেখা দিতে পারে।
ASD থাকলে আরও যে যে লক্ষণ দেখা যেতে পারে ঃ
 অত্যধিক জেদ বা বদমেজাজীপনা।
 খেয়ালিপনা বা মেজাজের তারতম্যের প্রকাশ। বোঝা যায় না কেন কোন কোন সময়ে তারা বিষন্ন হয়ে পড়ে অথবা হাসতে থাকে।
 আক্রমণাত্মক/ ধ্বংসাত্মক আচরন করা (অল্প কিছুজনের মধ্যে দেখা যায়)।
 অদ্ভুত ধরনের ভয় বা আতন্ক যেমন- টিভিতে কোনও বিশেষ বিজ্ঞাপন দেখলে ভয় পাওয়া।
 নিজের শরীরকে আঘাত করার প্রবনতা, যেমন- নিজে হাত কামড়ানো, মাথা ঠোকা।
 ঘুমের ব্যাপারে বিশেষ অনিয়ম থাকে-অতি অল্প ঘুমের প্রয়োজন হয়, রাতে জেগে থাকে।
 ঊৎকন্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকার এবং উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ার প্রবনতা থাকে।
 অত্যন্ত চঞ্চল ও অস্থির ধরনের হয়, নিজের অগ্রহ বা পছন্দের জায়গা ছাড়া অন্য কিছুতে মনোযোগ দেবার সময়সীমা কম।
 কয়েকজন শিশু বেশী রকম জেদি হয়, অন্যের কথার বিরুদ্ধাচরণ করে।
অটিজম কিভাবে নির্ণয় করা হয় ?
অটিজম স্পেকট্রাম নির্ণয় একটি দুই ধাপ প্রক্রিয়া –
প্রথমধাপেঃ একজন শিশু চিকিৎসক বা স্বাস্থ্য কর্মী দ্বারা সুস্থ্য শিশু চেকআপে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা হয়। যে সকল শিশুর বিকাশ গত সমস্যা সনাক্ত হয় তাদেরকে অধিকতর পর্যবেক্ষণ জন্য পাঠানো হয়।

দ্বিতীয়ধাপেঃ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও অন্যান্য প্রফেশনালদের সমন্বয়ে একটি পূণর্মূল্যায়ন করা হয়। এই পর্যায়ে শিশুর অটিজম বা অন্য কোন বিকাশ জনিত সমস্যা আছে কিনা তা নির্ণয় করা যায়। দুই বছর বয়সের মধ্যে শিশুদের অটিজম স্পেক্ট্রাম ডিজঅর্ডার নির্ভরযোগ্য ভাবে নির্ণয় করা যায় । যদিও গবেষণা বলে যে কিছু সনাক্তকরণ পরীক্ষা ১৮ মাস বা আরও অল্পবয়সে সনাক্ত করণে সহায়তা করতে পারে।

অটিজম স্পেক্ট্রাম ডিজঅর্ডার সনাক্তকরণের টুলসমূহঃ
 স্কুলে যাওয়ার আগের বয়সের শিশুদেও জন্য প্রযোজ্য

টুলসমূহঃ
 চেকলিস্ট ফর অটিজম ইন টডলার্স (CHAT)
 মডিফাইড চেকলিস্ট ফর অটিজম ইন টডলার্স (M-CHAT)
 স্ক্রিনিংটুল ফর অটিজম ইন টুইয়ারওলডস (STAT)
 সোশ্যাল কমিউনিকেশন কোশ্চেনেয়ার (SCQ)
 কমিউনিকেশন এন্ড সিম্বোলিক বিহেভিয়ার স্কেল (CSBS)
এই বয়সের চেয়ে বড় শিশুদের মৃদু মাত্রার অটিজম স্পেক্ট্রাম ডিজ অর্ডার বা এসপার্গারসডিন্ড্রোম সনাক্ত করার জন্য চিকিৎস করা নিম্নলিখিত সনাক্তকরণ টুলসহ অন্যান্য টুলের উপর নির্ভর করেনঃ
 অটিজম স্পেক্ট্রাম স্ক্রিনিং কোশ্চেনেয়ার (ASSQ)
 অস্ট্রেলিয়ান স্কেল ফর এসপার্গারসসিন্ড্রোম (ASAS)
 চাইল্ডহুড এসপার্জারস সিন্ড্রোম টেস্ট (CAST)
অটিজমের চিকিৎসা কি?
যদিও অদ্যবধি অটিজমের সম্পূর্ণ নিরাময় যোগ্য কোন চিকিৎসা পদ্ধতি প্রমাণিত হয়নি, তথাপি অটিজমের দ্রুত চিকিৎসা, যথোপযোগী স্কুল শিক্ষা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ এবং সঠিক স্বাস্থ্য সেবা একটি শিশুর অটিজমের সমস্যাগুলি অনেক হ্রাসকরে, শিশুর সঠিকভাবে বেড়ে ওঠা ও নতুন দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
অটিজম সনাক্ত হলে অভিভাবকের ক্ষেত্রে করণীয়ঃ
 লক্ষণগুলোকে গোপন করবেন না
 হতাশ হবেন না
 অযথা বিভ্রান্তি— থেকে মুক্ত থাকুন
 সমস্যাটির ব্যাখ্যা গ্রহন করুন
 পরিবারের সদস্যরা সম্মিলিত সিদ্ধন্ত গ্রহন করুন
 নিজেদের দায়ী করবেন না
 ধৈর্য্য ধরুন
 সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহন করুন
 শিশুকে সামাজিকতা শেখান
 শিশুর সাথে খেলুন
 শিশুকে খেলতে দিন
 শিশুকে ভাষা শেখান
 শিশুকে প্রতিকী ভাষার ব্যবহার বোঝান
 শিশুর জন্য শব্দ ভান্ডার ব্যবহার করুন
 শিশুকে ব্যক্তিগত কাজ শেখান
 শিশুর ইচ্ছা ও শখকে প্রাধান্য দিন
 শিশুর মা-বাবা হিসেবে প্রশিক্ষণ নিন
 গ্র“প তৈরী করে গ্র“পে প্রশিক্ষণ নিন
 কাঙ্খিত আচরনের জন্য শিশুকে পুরষ্কার প্রদান করুন
 দিন লিপি সংরক্ষণ করুন
 চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন।

সহকারী অধ্যাপক, শিশু বিভাগ
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ।




No Comments to “শিশুর অটিজমের লক্ষণ ও করণীয়”

Comments are closed.