সাইনাসের সমস্যায় সমাধান কী



  • Add Comments
  • Print
  • Add to Favorites

সন্ধে নামলেই নাক দিয়ে ঢুকছে হিমেল বাতাস। ঠান্ডা লাগলেই চিত্তির। সাইনুসাইটিসের কবলে পড়াও বিচিত্র কিছু নয়। শীতকালে বহু মানুষই ভোগেন অ্যাকিউট এবং ক্রনিক সাইনাসের সমস্যায়। অসুখ সারাতে পরামর্শ দিলেন কেপিসি মেডিক্যাল কলেজের ইএনটি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ দ্বৈপায়ন মুখোপাধ্যায় এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হোমিওপ্যাথির ডেপুটি মেডিক্যাল সুপারিনটেনডেন্ট ডাঃ প্রলয় শর্মা।

সাইনুসাইটিস রোগের প্রভাব বাড়ছে 

সাইনুসাইটিস একটি অতি পরিচিত রোগ। অসংখ্য মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হন। আসলে আমাদের মুখমণ্ডলের অন্দরে হাড়ের মাঝে মাঝে কুঠুরির মতো ছোট ছোট ফাঁকা জায়গা রয়েছে। এই কুঠুরিগুলির মধ্যে হাওয়া চলাচল করে। মুখমণ্ডলের এই ‘এয়ার পকেট’-গুলিকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে সাইনাস বলা হয়। কপালের কাছে রয়েছে ফ্রন্টাল সাইনাস, নাকের দু’পাশে গালের নীচে আছে ম্যাক্সুলারি সাইনাস, চোখের পাশে থাকে ইথময়ডাল সাইনাস।
আসলে প্রতিটি সাইনাসের খোলা দিকটা থাকে নাকের ভিতরের ন্যাজাল ক্যাভিটিতে। আমরা যখন শ্বাস নিই, তখন সেই বায়ু গিয়ে সাইনাসে প্রবেশ করে। আবার সাইনাসে প্রবেশকারী সেই বায়ু নাক দিয়েই বাইরে বেরিয়ে যায়। এভাবেই ভেন্টিলেটরের মতো কাজ করে সাইনাস। এটা গেল একটা দিক। আবার অন্যদিকে সাইনাস থেকে জলের মতো তরল বেরয়। এই তরল নাকের ভিতরের অংশকে পরিষ্কার রাখে। কোনও কারণে নাকের ভিতরে সাইনাসের খোলা দিকটি বন্ধ হয়ে গেলেই সাইনুসাইটিস রোগটি হয়। এই রোগে সাইনাসের কুঠুরির ভিতরে পুঁজ (পাস) জমে। সাধারণত সাইনাসে জমে থাকা পুঁজ নাকের মধ্যে দিয়ে বাইরে আসে। কারও আবার পুঁজ নাকের পিছন দিয়ে গলায় চলে যায়।

মাথা যন্ত্রণাই প্রাথমিক লক্ষণ
সাইনুসাইটিস রোগে আক্রান্ত কোনও রোগীর চিকিৎসকের কাছে প্রাথমিক অভিযোগ থাকে মাথা যন্ত্রণার। তবে এটাকে ঠিক তীব্র মাথা যন্ত্রণা বলা যাবে না। সারাদিন মাথা দম ধরে থাকে। মাথা ভারী ভারী লাগে। অনেকের আবার মুখের চারপাশেও সামান্য ব্যথা থাকে। পাশাপাশি গ্রাস করে ক্লান্তি। কারও কারও মৃদু জ্বরও থাকতে পারে। শরীরের তাপমাত্রা ৯৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট থেকে ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। সঙ্গে বুকে কাশিও থাকে।

ইনফেকশনই প্রধান কারণ
প্রধানত ইনফেকশন বা ইনফ্লামেশন (প্রদাহ) থেকেই সাইনুসাইটিস হয়। আর এই ইনফেকশন হওয়ার মূলে রয়েছে অ্যালার্জি। আসলে নগরায়ণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্রমশ বাড়ছে সাইনুসাইটিস রোগের প্রকোপ। নগরায়ণের জন্য দূষিত হচ্ছে বায়ু। বাতাসে ধুলো-ধোঁওয়ার পরিমাণ বাড়ছে। আর ধুলো-ধোঁওয়া থেকে বাড়ছে নাকের অ্যালার্জির প্রকোপ। নাকে অ্যালার্জি হলে নাকের ভিতরের মিউকোসাল লেয়ার ফুলে যায়। বন্ধ হয়ে যায় সাইনাসের খোলা দরজা। দেখা দেয় সাইনুসাইটিসের সমস্যা।
এছাড়া নাকের হাড় বেঁকা থাকলেও সাইনাসের খোলা দরজা বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি পলিপ থেকেও অনেকের সাইনুসাইটিসের সমস্যা হতে পারে। পলিপ নাকের ভিতর জলভরা বেলুনের মতো হয়। এটা সাইনাসের ভিতরে তৈরি হয়। ধীরে ধীরে সেটা সাইনাসের ভিতর থেকে নাকের মধ্যে চলে আসে। ফলে নাকের মধ্যে স্বাভাবিক বায়ু চলাচল ব্যহত হয়। পলিপের সমস্যায় রোগীর নাক বন্ধ হয়ে যায়, মাথায় যন্ত্রণা হয় এবং নাকে গন্ধও পাওয়া যায় না।

বয়সেরও গুরুত্ব আছে
সাইনুসাইটিসের সমস্যা বয়ঃসন্ধি থেকে মধ্যবয়স্কদের মধ্যেই বেশি পাওয়া যায়। বয়সের হিসেবে বললে, ১৫ থেকে ৫০ বছর বয়সি মানুষের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে বেশি। বাচ্চাদের এই সমস্যা বড়দের তুলনায় বেশ কম হয়। আসলে ছোট বয়সে মুখের ভিতরে সবকটি সাইনাস কুঠুরি তৈরিই হয় না। তাই সমস্যা হওয়ার আশঙ্কাও থাকে কম।

চিকিৎসা জরুরি
রোগ চিকিৎসার প্রাথমিক পর্যায় হল রোগ নির্ণয়। এক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে রোগীর রোগ লক্ষণগুলির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এরপর চিকিৎসক রোগীর নাক পরীক্ষা করে দেখতে পান সাইনাসের দরজাগুলিতে পুঁজ জমে রয়েছে। চিকিৎসক মনে করলে ন্যাজাল এন্ডোস্কোপ, সাইনাসের এক্স-রে বা সিটি স্ক্যান করেও দেখে নেন।
রোগ নির্ণয়ের পর রোগটা অ্যাকুউট না ক্রনিক এই বিষয়ে বিশেষ জোর দিতে হয়। অ্যাকিউট সাইনুসাইটিস হঠাৎ করে হয় এবং ঠিকমতো ওষুধ খেলে ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে রোগ সেরে যায়। অন্যদিকে ক্রনিক সাইনুসাইটিসে রোগভোগ চলতেই থাকে।
অ্যাকুউট সাইনুসাইটিসের চিকিৎসায় রোগীকে ৭ থেকে ১০ দিন একটা অ্যান্টিবায়োটিক খেতে বলা হয়। পাশাপাশি রোগীকে প্যারাসিটেমল এবং অ্যান্টিঅ্যালার্জিক ট্যাবলেট খাওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়। কিছুক্ষেত্রে রোগীকে ন্যাজাল ড্রপ দেওয়ারও প্রয়োজন পড়ে।
রোগভোগ এক থেকে দু’মাস চলতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ন্যাজাল এন্ডোস্কোপি এবং সাইনাসের এক্স-রে করিয়ে নিতেই হয়। ক্রনিক সাইনুসাইটিস চিকিৎসার প্রথম পর্যায় হল মেডিক্যাল ম্যানেজমেন্ট। এক্ষেত্রে চিকিৎসক রোগীকে ১৫ থেকে ২০ দিনের একটা অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স দিয়ে থাকেন। সঙ্গে দেওয়া হয় স্টেরয়েড ন্যাজাল স্প্রে এবং প্যারাসিটেমল। এই পদ্ধতিতে ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে সাফল্য আসে। আর বাদবাকি ক্ষেত্রে ফাংশনাল এন্ডোস্কোপিক সাইনাস সার্জারি করাতে হয়। এটি অত্যন্ত সাধারণ একটি সার্জারি। বাইরে থেকে প্রায় কাঁটাছেঁড়া করতেই হয় না। রোগীকে বড়জোর একদিন হাসপাতালে কাটাতে হতে পারে। সার্জারির পর বেশিরভাগ রোগীরই আর সাইনুসাইটিসের সমস্যা থাকে না।

আগেভাগে সাবধান হোন 
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত অ্যালার্জির প্রকোপ থাকে বেশি। তাই এখন থেকেই বেশকিছু সাবধনতা অবলম্বন করে চলাই ভালো—সপ্তাহে অন্তত একবার বিছানার চাদর এবং বালিসের ঢাকা আধঘণ্টা গরম জলে ভিজিয়ে নিয়ে কেচে নিতে হবে। এভাবে কাচলে কাপড়ে থাকা জীবাণু অনায়াসে মরে যাবে  ধুলো-ধোঁওয়া এড়িয়ে চলতে হবে। ঘর পরিষ্কার করার সময় অবশ্যই মুখে কিছু জড়িয়ে নিন। রাস্তায় বেরলে মাস্ক পরে নেবেন  বাড়ির পোষ্য থেকেও অ্যালার্জি হতে পারে। তাই পোষ্যের থেকে যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রাখুন  সুগন্ধি (বডি স্প্রে, মশার ধুপ) থেকে অ্যালার্জির প্রবণতা থাকলে, দূরে থাকুন  আর মাথা ব্যথা, জ্বর, সর্দি, কাশির মতো লক্ষণ দেখা দিলেই চিকিৎসকের কাছে যান।

No Comments to “সাইনাসের সমস্যায় সমাধান কী”

Comments are closed.