সুস্থতা ও প্রবাস জীবন

0
33

রুনা রহমান

অভিবাসন স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ না হলেও অভিবাসীদের জীবন-যাপনের সাথে স্বাস্থ্যের সম্পর্ক রয়েছে। প্রবাসে যেতে হলে অবশ্যই সুস্থ থাকতে হবে। প্রবাসে কর্মক্ষম থাকার প্রথম শর্ত সুস্থতা।

অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা-সব কিছু মিলেই স্বাভাবিক জীবন। স্বাভাবিক জীবনের এই উপাদান গুলোর যোগান ঘটায় অর্থ। যাদের কাছে অর্থ নেই তাদের স্বাভাবিক জীবনে ঘটে ছন্দপতন। ঘরে যখন হাহাকার দেখা দেয়, ক্ষুধার্ত মানুষ তখন ছোটে অর্থ রোজগারের আশায়। পরিচিত গন্ডি পেরিয়ে, আপন-জন, কাছের মানুষদের ছেড়ে পাড়ি জমায় পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে।

যে স্বপ্নের হাতছানিতে দেশ ছেড়ে প্রবাসে পাড়ি জমানো, তা সম্পূর্ণই নির্ভর করে সু-স্বাস্থ্যের উপর। একজন সুস্থ মানুষ তাঁর স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তা দিয়ে যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারে।

দেশে আমরা যখন পরিবার -পরিজনের সাথে থাকি, তখন আমাদের কোন সমস্যা হলে পরিবারের কেউ না কেউ পাশে এসে দাড়াঁয়। প্রবাসে এটা সব সময় সম্ভব হয়না। জীবনের প্রতিযোগিতায় সকলকে ছুটতে হয় সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে। ইচ্ছা থাকলেও কেউ পাশে এসে দাড়াঁতে পারেনা।

আমরা সকলেই জানি,“স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল”। প্রবাস জীবনে যে কোন ব্যক্তির সুস্থ্যতার বিকল্প নেই। প্রবাসে নিজের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়। তৃষ্ণায় মরে গেলেও অনেক সময় পাশে কেউ থাকেনা এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেবার জন্য। তাইতো প্রতিটি প্রবাসীকে সব সময় চেষ্টা করতে হবে শারীরিক ও মানসিক ভাবে সুস্থ থাকতে। মনের সাথে শরীরের সম্পর্ক নিবিড়। সেজন্য একজন মানুষ যখন মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়ে, তখন তার শারীরিক প্রতিক্রিয়া ঘটে।

জীবন-যুদ্ধে পরাজিত ভঙ্গুর স্বাস্থ্য নিয়ে পৃথিবীর কোথাও কিছু করা সম্ভব নয়, এটা আমাদের সকলের মনে রাখতে হবে।

একজন প্রবাসী কর্মী/ শ্রমিককে প্রবাসে যাওয়ার সময় যত নিয়ম-কানুন পালন করতে হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো ‘মেডিকেল পরীক্ষা’। প্রবাসে নিয়োগ দাতাদের আরোপিত শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম শর্ত হলো মেডিক্যাল চেক-আপ। একজন কর্মী/ শ্রমিক যে দেশে যেতে চায় সে দেশের অ্যাম্বাসী বা দূতাবাসে অন্যান্য কাগজের সাথে মেডিক্যাল পরীক্ষার ফলাফল জমা দিতে হয়। এর উপর নির্ভর করে ভিসা পাওয়া না পাওয়া।

কোন শ্রমিক শারীরিক ভাবে সুস্থ বা কর্মক্ষম বলে প্রমাণিত হলেই কেবল তাকে বর্হিগমন ছাড়পত্র দেয়া হয়। যারা অনৈতিক ভাবে এই কাগজ জমা দেয় পরবর্তিতে তাদের অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়।

মেডিকেল পরীক্ষার সময় যেসব বিষয় লক্ষ রাখা জরুরীঃ

** সঠিক স্থানে মানসম্মতভাবে পরীক্ষা হয়েছে কিনা জানতে হবে

** কতবার মেডিকেল পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং কেন করা হচ্ছে তা জানতে হবে।

** পরীক্ষার ফলাফল আন-ফিট হলে, কেন হয়েছে তা জেনে নিতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে।

** কোনো যৌনরোগ ধরা পড়লে লজ্জা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

** যেকোনো ধরনের মেডিকেল পরীক্ষার ভাউচার বা রশিদ দেখতে হবে বা সংগ্রহে রাখতে হবে।

** পরীক্ষার আন-ফিট ফলাফলকে ফিট করার যেকোন প্রলোভন থেকে সাবধান থাকতে হবে।

প্রবাসে একজন শ্রমিক/কর্মী অসুস্থ হয়ে পড়েন যেসব কারণে

 নতুন পরিবেশে নতুন খাবার ও পানীয় পানে অভ্যস্ত না হওয়ার কারণে খাবারে অরুচি দেখা দেয়। অনেক সময় পেটের অসুখ হয়।

 কোন প্রবাসী যখন কোন দেশে যায়, সে দেশের পরিবেশ ও আবহাওয়া সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকায় সে দেশে যাওয়ার পরপরই অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে।

 ভাষা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে মনের ভাব আদান-প্রদান করতে পারেনা। ফলে তার কাজ করতে সমস্যা হয়। কাজের ফল ভাল না হওয়ার কারণে অনেকেই মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পরে।

 অনেক শ্রমিককে পরিবার-পরিজন ছেড়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে, বিছানাপত্র বিহীন, পোকা-মাকড়ের সাথে বাস করতে হয়।

 অজ্ঞতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের ফলে একজন অভিবাসীর চাকরিচ্যুতি, অর্থনাশ, পরিবার ও সহকর্মীদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট, চরম অসুস্থতা ও মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে ব্যর্থভাবে দেশে প্রত্যাবর্তন এমনকি জীবন সংশয় পর্যন্ত হতে পারে।

যেসব কারণে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়েঃ

 শিক্ষা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, তথ্য, জ্ঞান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে ধারণার অভাব

 প্রযোজনীয় তথ্য, পরামর্শ ও চিকিৎসার অভাব

 আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবধান, সুস্থ বিনোদনের অংশ গ্রহনের সীমাবদ্ধতা

 সহকর্মীদের প্ররোচনা

 অস্বাস্থ্যকর উপাদানের সহজলভ্যতা

 সহজে যৌনসম্পর্ক স্থাপনের অধিকতর সুযোগ

 মহিলাদের ক্ষেত্রে বৈষম্য, নিম্মস্তরের কাজ, যৌন হয়রানি এবং নিপীড়ন

 প্রবাসে নারী শ্রমিকদের চলাচলের স্বাধীনতা, যোগাযোগের সক্ষমতা, এ সকল কারণেই অভিবাসীরা বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ে এবং সহজে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে লিপ্ত হয়।

স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে করণীয়ঃ

 মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তাপমাত্রা অনেক বেশী। সেখানে পৌঁছানোর পরপরই অনেকেই ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেনা, ফলে অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে কারণে আগে থেকেই সব কিছু জেনে নিতে হবে।

 নিয়মিত প্রচুর পরিমানে পানি পান করতে হবে।

 সকল অভিবাসীর বসবাসের স্থান পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত এবং যথেষ্ট আলো বাতাসপূর্ণ হওয়া উচিত।

 মহিলাদের ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু সময়ে সাবধান থাকতে হবে এবং পরিষ্কার

পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে।

 মানুষের স্বাভাবিক জীবনের আর একটি বৈশিষ্ট্য হলো যৌন সম্পর্ক। যাদের জীবনে এই স্বাভাবিকতা থাকেনা তারা অনেক সময়ই অসুস্থ থাকে। তাই এ ধরনের সম্পর্কের সময় সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত।

 ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় যেভাবেই হোক যৌন সম্পর্কের সময় সাবধান থাকা অতি আবশ্যক। কারণ এইডস এর মতো ঘাতক রোগের সংক্রমণ ঘটে অসাবধানতার কারণে। পরিণতি হতে পারে চরম।

 মহিলাদের বিশেষভাবে এইচআইভি ও যৌনরোগ সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন, কারণঃ মহিলারাই মূলত যৌন হয়রানি ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে।

 নারী শ্রমিকরা প্রবাসে গর্ভবতী হয়ে পড়লে ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভপাত করাতে বাধ্য হয়, যা তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য ও যৌন স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

Womens-Health

প্রবাসে যারা পরিবার-পরিজন ছাড়া থাকেন তাদের জীবনের অনেক কিছুতেই সমঝোতা করে চলতে হয়। যে পরিবার পরিজনের কথা ভেবে দেশ ছেড়ে প্রবাসে পাড়ি জমানো সে পরিবারের কথা ভেবেই প্রবাসীদের থাকতে হবে সুস্থ। মনে রাখতে হবে জীবন মানেই সংগ্রাম। তাই ভেঙ্গে না পরে দ্বিগুণ উদ্দোমে পরিবেশ পরিস্থিতিকে মেনে নিয়ে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করার চেষ্টা করতে হবে। সাফল্য আসবেই সংগ্রামীদের জীবনে।

 probashmela