স্বপ্ন দেখছে অটিস্টিক শিশুরা – সুনামগঞ্জ প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্যে কেন্দ্র



  • Add Comments
  • Print
  • Add to Favorites

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার দুর্গম একটি গ্রাম উকারগাঁও। সেই গ্রামের সফির উদ্দিনের তিন বছর বয়সী কন্যা তাসলিমা চিকিৎসকদের মতে অটিস্টিক শিশু। এই বয়সে তাসলিমা হেসে-খেলে ঘরময় ছুটোছুটি করার কথা থাকলেও স্বাভাবিক চলাফেরারও শক্তি নেই তার। এক সপ্তাহ আগে তাসলিমার মা খবর পেয়ে এসেছেন প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে। রেজিস্ট্রেশন করে এখন তিনি সহায়ক উপকরণ ব্যবহার করে থেরাপি দিচ্ছেন মেয়েকে। এই কয়দিন থেরাপি দেবার পর মেয়েকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন বাবা-মা।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার গণিগঞ্জ গ্রামের শহীদুল্লাহর ১৭ মাস বয়সী জান্নাতকেও তার মা নিয়ে এসেছেন সেবা কেন্দ্রে। পায়ে-হাতে থেরাপি দিয়ে উপকরণ ব্যবহার করে মেঝেতে একাই ছেড়ে দিয়েছেন মেয়েকে। তিনি ঘরের কোণে বসে দেখছেন মেয়ের ছুটোছুটি। উজান তাহিরপুর থেকে ২০ মাস বয়সী ছেলে আলী রাজকে নিয়ে এসেছেন বাবা আলিম উদ্দিন। একটি থেরাপি বক্সের ভেতর ছেলেকে ছেড়ে দিয়ে ছেলের নড়াচড়া প্রত্যক্ষ করছেন তিনি। শহরতলির লালপুর গ্রামের সেলিম উদ্দিন তার চার বছল বয়সী কন্যা সাথীকে নিয়ে এসেছেন সেবা কেন্দ্রে। মেয়ে দাঁড়াতে ও বসতে পারেনা। বিছানায় পড়ে থাকতো। এখন বেশ কিছুদিন ধরে থেরাপি নেওয়ায় তার মেয়ে নিজে নিজে বসতে পারে। এভাবে অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন স্বজনরা। থেরাপি নেওয়ার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শও নিচ্ছেন বিনামূল্যে। সম্প্রতি সুনামগঞ্জ প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্যে কেন্দ্রে গিয়ে প্রতিবন্ধী শিশুদের সেবার চোখজুড়ানো এই দৃশ্য দেখা গেল। শুধু শিশুরাই নয় সরকারি ছুটির দিন বাদে নানা বয়সের নারী ও পুরুষরাও বিভিন্ন ধরনের থেরাপি নিচ্ছেন বিনামূল্যে। তবে পরিসংখ্যানে নারীরা পিছিয়ে আছেন।
জেলা প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, বিনামূল্যে সবধরনের থেরাপি ও চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি ১২ ধরনের প্রতিবন্ধীদের ধরণ চিহ্নিত করা হয় এখানে। সেবা ও থেরাপির সঙ্গে প্রতিবন্ধীদের জন্য সহায়ক উপকরণ বিতরণ করা হয়। প্রতিদিন গড়ে ৫০ জনেরও বেশি লোক নানা ধরনের থেরাপি নিচ্ছেন। সম্প্রতি অটিস্টিক শিশুদের সেবা নেওয়ার হারও বাড়ছে। মোবাইল ভ্যান দ্বারা প্রতিবন্ধীদের সেবা ও থেরাপিও দেওয়া হচ্ছে গত বছর থেকে। সেবা ও থেরাপির পাশাপাশি প্রতিবন্ধিতার ধরণ চিহ্নিতকরণ, সচেতনতা তৈরি, প্রতিবন্ধীদের কি ধরনের সহায়ক উপকরণ, থেরাপি ও চিকিৎসা প্রয়োজন তার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে। প্রতি বছরই সেবার হার বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানালেও পরিসংখ্যানে সেবা নিতে আসা নারীরা রয়েছেন অনেক পিছনে। গ্রাম এলাকা থেকে আগত রোগী ও তাদের স্বজনরা প্রচারণা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই সেবা সম্পর্কে গ্রামের মানুষ অবগত নন।
সূত্র জানায়, এই কেন্দ্রে ২০১৫ সালে ৩ হাজার ৯৩৬ জন সেবা নিয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ২ হাজার ৩৫৫ জন এবং মহিলা ১ হাজার ৫৭৬ জন। সেবাপ্রার্থীদের মধ্যে থেরাপি নিয়েছেন ৯৯ ভাগ রোগী। ২০১৬ সনে ৩ হাজার ৫৭৭ জন পুরুষ ও ১ হাজার ২৭৫ জন নারীসহ মোট সেবা নিয়েছেন ৪ হাজার ৮৫৭ জন। এর আগের বছর নারীদের সেবার হার ৪০ ভাগ থাকলেও এই বছর নারীদের সেবার হার কমেছে। নারীরা সেবা নিয়েছেন মাত্র ২৬ ভাগ। বিপরীতে পুরুষদের সেবার হার বেড়েছে। পুরুষরা ২০১৫ সনে ৬০ ভাগ সেবা নিলেও এই বছর ৭৪ ভাগ পুরুষ সেবা নিয়েছেন। ৪ হাজার ৮৫৭ জনের মধ্যে ফিজিও থেরাপি সেবা নিয়েছেন ৮০ ভাগ লোক। ২০১৭ সনে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেবা নিয়েছেন ১০ হাজার ৯৮৪ জন। পুরুষ ৭ হাজার ২২০ জন এবং মহিলা ৩ হাজার ৭৬৪ জন। পুরুষদের সেবার হার ৭৩ এবং নারীদের সেবার হার ২৭ ভাগ। সেপ্টেম্বরে ৪০ ভাগ সেবাপ্রার্থী ফিজিওথেরাপি এবং ৪০ ভাগ রোগী পরামর্শ নিয়েছেন।
সেবা নিতে আসা রোগীদের স্বজনরা জানালেন নারী ফিজিওথেরাপি সহকারি না থাকায় সেবা নিতে আসা নারীদের সংখ্যা কম। তারা নারী ফিজিও থেরাপি সহকারি নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন।
সেবা নিতে আসা ওবায়দুর রহমান কুবাদ বলেন, আমাদের অঞ্চলের নারীরা অন্যান্য এলাকার তুলনায় রক্ষণশীল। অনেক নারী ফিজিও থেরাপি নিতে এসে শুধু পরামর্শ নিয়েই চলে যাচ্ছেন। মহিলা দ্বারা ফিজিও থেরাপির ব্যবস্থা না থাকায় অধিকাংশ নারীই ফিরে যাচ্ছেন। তিনি একজন মহিলা নিয়োগের দাবি জানান।
প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের কনসালটেন্ট (ফিজিওথেরাপি) ডা. তানজিল হক বলেন, আমাদের এখানে বিভিন্ন বয়সের সেবাপ্রার্থীদের সংখ্যা বেড়েই চলছে। এখন দূর-দূরান্ত থেকেই রোগীরা সেবা নিতে আসছেন। বিশেষ করে অটিস্টিক শিশুদের সংখ্যা এখন বাড়ছে। তারা সহায়ক উপকরণ ব্যবহার করে সেবা নিচ্ছে। পরিসংখ্যানে নারীদের সেবা নেওয়ার হার কম কেন জানতে চাইলে বলেন, আমাদের যারা থেরাপি দেন তারা সবাই পুরুষ। মহিলা থেরাপি সহকারি নেই। তাই অনেক মহিলা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সেবা নিতে আসেন না। মহিলা নিয়োগ দেওয়া হলে এই সমস্যা কমে যাবে বলে তিনি জানান।
জেলা প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী বলেন, সবধরনের ফিজিও থেরাপির পাশাপাশি ১২ ধরনের প্রতিবন্ধী নির্ণয় করা হয় আমাদের এখান থেকে। আমরা প্রতিবন্ধীদের মধ্যে নিয়মিত সহায়ক উপকরণ বিতরণ করি। তাছাড়া মোবাইল ভ্যানের মাধ্যমে এখন প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়েও প্রচারণার পাশাপাশি সেবা ও থেরাপি দেওয়া হচ্ছে। সেবাপ্রার্থীদের সংখ্যা বাড়ছে। মহিলাদের থেরাপির জন্য একজন মহিলা থেরাপি সহকারি নিয়ে আসা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

No Comments to “স্বপ্ন দেখছে অটিস্টিক শিশুরা – সুনামগঞ্জ প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্যে কেন্দ্র”

Comments are closed.