ঢাকা কেন্দ্রিক ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা, মিটছে না চাহিদা

প্রতিবেদন

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ওমর ফারুকের ১২ বছর বয়সী কন্যা সামিয়া আক্তার। সেরিব্রাল পলসিতে আক্রান্ত এই শিশুকে অন্য চিকিৎসার পাশাপাশি নিয়মিত ফিজিওথেরাপি দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক।

এরপরই চিন্তায় পরে যান ওমর ফারুক। কেননা সামিয়াকে চিকিৎসা দেওয়ার মত মানসম্মত ফিজিওথেরাপি সেন্টার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নেই। বাড়ি থেকে নিয়মিত ঢাকায় আসার সুযোগও কম।

শেষ পর্যন্ত রাজধানীর পক্ষাঘাতগ্রস্থ পুনর্বাসন কেন্দ্র- সিআরপিতে ১৪ দিনের জন্য ভর্তি করা হয় তাকে।

ওমর ফারুক বলেন, পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকা সম্ভব না। আবার বাড়ি ফিরে গেলে চিকিৎসা ব্যাহত হয়।

“টানা থেরাপি দিতে না পারায় মেয়ের তেমন উন্নতিও হচ্ছে না। ১৪ দিনের জন্য স্ত্রী বাচ্চাকে নিয়ে সিআরপিতে গেলে পরিবারের অন্যরা ঝামেলায় পড়ে যায়। কাছাকাছি এই সুবিধা থাকলে হয়ত তার আরও ভালো চিকিৎসা দিতে পারতাম।”

ওমর ফারুকের মত অনেককেই এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ঢাকার বাইরের রোগীরা ভুগছেন বেশি। আর রাজধানীর মধ্যেও হাতের কাছে ফিজিওথেরাপি সেন্টার অপ্রতুল হওয়ায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বেশিরভাগের।

এর সঙ্গে ভুয়া ও মানহীন ফিজিওথেরাপি সেন্টারের কারণে কাউকে কাউকে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

দেশে ফিজিওথেরাপি সুবিধা প্রয়োজনের তুলনার কম বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকও।

তিনি বলেন, “এই চিকিৎসা পদ্ধতির আগে তেমন গুরুত্ব ছিল না। তবে বর্তমানে মানুষের নানা শারীরিক সমস্যা, দুর্ঘটনা, স্ট্রোকসহ নানা কারণে ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব বেড়েছে।

“এ কারণে আমিও মনে করি এখানে আরও বেশি নজর দেওয়া দরকার।”

বিভিন্ন হাসপাতাল ও জেলা পর্যায়ে ফিজিওথেরাপিস্ট পদায়নের চিন্তা করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি তিনি বলেন, “২০২০ সালে আমরা একটি জনবল কাঠামো তৈরি করেছি। ওই কাঠামোর মধ্যে আমরা সবকিছু ইনক্লুড করেছি। হয়ত একবারে হবে না, পর্যায়ক্রমে নিয়োগ দেওয়া যাবে।”

নানা শারীরিক সমস্যা বা রোগে আক্রান্ত সব বয়সীদের জন্য বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াবিহীন চিকিৎসা ফিজিওথেরাপির চাহিদা বাংলাদেশেও দিনদিন বাড়ছে। চিকিৎসকরা এখন অনেক বেশি পরামর্শ দিচ্ছেন এ চিকিৎসা ব্যবস্থার।
তবে প্রয়োজনের তুলনায় ফিজিওথেরাপি কেন্দ্র ও ফিজিওথেরাপিস্টের সংখ্যা খুবই কম। ঢাকার বাইরের বড় শহর ছাড়া অন্য শহরে এ সেবা তেমন মেলে না বললেই চলে।

আবার ঢাকা বা ঢাকার বাইরে যেগুলো আছে তাতেও প্রশিক্ষিত ফিজিওথেরাপিস্ট নেই। ফলে কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছে না মানুষ।

এ সুযোগে সবখানেই গড়ে উঠেছে ভুয়া ও নিবন্ধনহীন ফিজিওথেরাপি সেন্টার। এতে অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছেন অনেকেই।

বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, দেশে প্রায় তিন হাজারের মত ফিজিওথেরাপিস্ট রয়েছেন। আর ঢাকাতেই রয়েছে ২ হাজার ৩০০ এর মত বেসরকারি ফিজিওথেরাপি সেন্টার।

এ অবস্থায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালগুলোয় ফিজিওথেরাপির জন্য পদ তৈরি, ফিজিওথেরাপিস্ট তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বুধবার এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস পালিত হয়েছে দেশে।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

মাংসপেশী, হাড় ও জয়েন্টের সমস্যা, অর্থোপেডিকস, স্নায়ু রোগ, শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা, শিশুদের বিকলাঙ্গতাজনিত সমস্যা, দুর্ঘটনা বা খেলাধুলায় আঘাতজনিত সমস্যা, গর্ভকালীন এবং গর্ভদান পরবর্তী শারীরিক সমস্যা, বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যার কারণে সাধারণত ফিজিওথেরাপির পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের শাখা হিসেবে ফিজিওথেরাপি খুবই গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা.এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, অনেক রোগের চিকিৎসায় ওষুধের পাশাপাশি ফিজিওথেরাপি প্রয়োজন হয়। এজন্য এই শাখায় আরও মনযোগ দেওয়া দরকার।

“বিশেষ করে যত ধরনের ব্যথা আছে- কোমর, হাঁটুর ব্যথা, জয়েন্ট পেইন, বিভিন্ন স্নায়ুরোগসহ অনেক রোগের জন্য ফিজিওথেরাপি প্রয়োজন। এটা আমাদের চিকিৎসার একটা বড় অংশ। ফিজিওথেরাপি থাকলে আমাদের জন্য অনেক হেল্প হয়। সব রোগের চিকিৎসার জন্য ওষুধে কাজ হয় না। ফিজিওথেরাপি দরকার।”

তিনি বলেন, “কিছু কিছু জায়গায় ফিজিওথেরাপিস্ট আছে। কিন্তু সেটা খুবই কম। এজন্য হাসপাতালগুলোতে পদ সৃষ্টি, লোক নিয়োগ এবং তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা খুবই দরকার। পাশাপাশি আরও ফিজিওথেরাপিস্ট তৈরির জন্যও উদ্যোগ নিতে হবে।”

ফিজিওথেরাপি চিকিৎসায় দেশের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান সাভারের সিআরপি। ২০২০ সালে এখানে ৭২ হাজার রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।

এখানকার ফিজিওথেরাপি বিভাগীয় প্রধান ও সিনিয়র কনসালটেন্ট মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন জানান, মাংসপেশী, হাড় ও জয়েন্টের সমস্যা নিয়ে যারা আসেন তাদের ৫০ শতাংশ মানুষ এসেছেন কোমরের সমস্যা নিয়ে।

১৩ শতাংশ ঘাড় ব্যথা, ১৫ শতাংশ হাঁটু ব্যথা, ৬ শতাংশ কাঁধের ব্যথা, ৫ শতাংশ টিস্যু ইনজুরি, ৩ শতাংশ ফ্র্যাকচার এবং ৬ শতাংশ স্পোর্টস ইনজুরি এবং বাকী ২ শতাংশ অন্যান্য রোগের কারণে চিকিৎসা নিতে আসেন।

স্নায়ুরোগের জন্য যারা ফিজিওথেরাপি নিতে আসেন তাদের ৬৮ শতাংশ স্ট্রোক, ৬ শতাংশ প্যারালাইসিস, ৬ শতাংশ স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি, ৫ শতাংশ মুখ বেঁকে যাওয়া রোগী এবং বাকিরা স্নায়ুরোগের অন্যান্য সমস্যা নিয়ে আসেন।

তিনি জানিয়েছেন, দেশে ফিজিওথেরাপির চাহিদা রয়েছে। কিন্তু ফিজিওথেরাপিস্টের সংখ্যা অপ্রতুল হওয়ায় মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছে না।

“এজন্য সরকারিভাবে উপজেলা হাসপাতাল থেকে টারশিয়ারি পর্যায়ের হাসপাতালে ফিজিওথেরাপি পদে নিয়োগ হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এই পদ্ধতির সঠিক চিকিৎসা পাবে।”

বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশনের এই সদস্য বলেন, সারা দেশের প্রতিবন্ধী এবং প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে থাকা রোগীরা ভুয়া এবং নিবন্ধনহীন ফিজিওথেরাপি সেন্টার হতে অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছেন। তদারকি না থাকায় যেখানে সেখানে ফিজিওথেরাপি সেন্টার গড়ে উঠছে।

“সারাদেশে ৩ হাজারের মতো ফিজিওথেরাপিস্ট, কিন্তু ঢাকায়ই ২ হাজার ৩০০ এর মত ফিজিওথেরাপি সেন্টার রয়েছে। অপচিকিৎসার কারণে প্রতিবন্ধী এবং প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে থাকা রোগীরা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছেন। যদি গ্রাজুয়েট ফিজিওথেরাপিস্ট, ডিপ্লোমা ফিজিওথেরাপি এবং ফিজিওথেরাপি অ্যাসিসটেন্টদের নিবন্ধন নম্বর দেওয়ার ব্যবস্থা করলে এটা রোধ করা সম্ভব।”

পড়ানো ও প্রশিক্ষণ যেখানে

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান-নিটোর, বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশন্স ইনস্টিটিউট, সাহিক ইনস্টিটিউট অব হেলথ সায়েন্স, ইনস্টিটিউট অব হেলথ অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা ফিজিওথেরাপি কলেজ, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ সায়েন্স, স্টেট কলেজ অব হেলথ সায়েন্স এবং রাজশাহীর ইনস্টিটিউট অব হেলথ অ্যান্ড টেকনোলজিতে ফিজিওথেরাপি পড়ানো হয়।

ঢাকার প্রতিষ্ঠানগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহীর প্রতিষ্ঠানটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published.